রশিদা খাতুনের দোকান ছবি: ধ্রুব নিউজ
যশোর শহরের বড় বাজার যখন তার দিনের শেষ হিসেব চুকিয়ে বিশ্রামের প্রস্তুতি নেয়, যখন কাপুড়িয়াপট্টি বা এইচ এম রোডের ঝকঝকে শোরুমগুলোর শাটার একে একে নামতে শুরু করে—ঠিক তখন ফুটপাথের এক কোণে টিমটিমে আলোয় শুরু হয় এক অন্যরকম জীবনযুদ্ধ। ঝুড়িভর্তি কচুর লতি, ডুমুর, কলার মোচা আর মাঠের বুনো শাক নিয়ে বসনে রাশিদা খাতুন। যখন শহর ঘুমায়, রাশিদার তখনো ‘দুপুর’।
আলমডাঙ্গার বণ্ডবিলার বাসিন্দা রাশিদা খাতুনের জীবনের ঘড়ি চলে ট্রেনের সময়সূচি মেনে। দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে তার এই রুটিন। প্রতিদিন বিকেল সাড়ে ৩টা বা ৪টের দিকে আলমডাঙ্গা স্টেশন থেকে কপোতাক্ষ বা রূপসা ট্রেনে চড়ে বসেন তিনি। সঙ্গে থাকে মাঠ-ঘাট ঘুরে সংগ্রহ করা সামান্য কিছু বন-সবজি। সন্ধ্যায় যশোর বড় বাজারে পৌঁছে শুরু করেন তার বেচাকেনা। দোকানপাট বন্ধ করে যারা বাড়ির পথ ধরা লোকজনই রাশিদার ক্রেতা। তার এই বিকিকিনি চলে রাত ১১টা-সাড়ে ১১টা পর্যন্ত।
রাশিদা জানান, অন্য বড় দোকানগুলো বন্ধ হলে তবেই তার পসরা জমে ওঠে। দিনশেষে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, আবার কোনো কোনো দিন হাজার টাকাও বিক্রি হয়। এই সামান্য আয়টুকুই তার সংসারের চালিকাশক্তি, স্বামীর ওষুধের পথ্য।
রাত ১২টা ২০ মিনিটে যশোর থেকে আবার ধরেন গোয়ালন্দ মেইল ট্রেন। যখন তিনি আলমডাঙ্গার বাড়িতে পৌঁছান, ঘড়িতে তখন রাত ৪টা। কিন্তু রাশিদার ঘুমের ফুরসত নেই। একটু জিরিয়েই ভোরে বেরিয়ে পড়েন মাঠে। খুঁজে নেন কচুর লতি, ঘাটকোল বা বুনো ওল। সংসারের কাজ শেষে আবার ছুটতে হয় স্টেশনে— গন্তব্য সেই যশোর।
ট্রেনের এই যাতায়াতই তার বিশ্রামের একমাত্র জায়গা। কখনো ট্রেনের মেঝেতে বা সিটে বসেই সেরে নেন রাতের ঘাটতি ঘুম। ট্রেনের টিটি বা স্টেশনের লোকজন তাকে চেনে— এক লড়াকু নারী হিসেবে। কেউ কখনো খারাপ ব্যবহার করেনি তার সাথে।
রাশিদার ব্যক্তিগত জীবনটাও যেন এক ধূসর ট্র্যাজেডি। দর্শনার অভাবী সংসারে বড় হওয়া রাশিদা ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়েছেন। কিশোরী বয়সেই বিয়ে হয়েছিল এক শ্রমজীবীর সাথে। তিন সন্তান হওয়ার পর সেই স্বামী তাকে ফেলে অন্য সংসার পাতেন। এরপর বর্তমান স্বামী আব্দুস সালামের সাথে সংসার শুরু করলেও ভাগ্য সহায় হয়নি। দুইবার স্ট্রোক করে আব্দুস সালাম এখন চলৎশক্তিহীন।
ছেলেরা বড় হয়ে যার যার মতো সংসার করলেও মায়ের দায়িত্ব শেষ হয়নি। এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ছোট ছেলের জন্য ৫০ হাজার টাকা দিয়ে কিনে দিয়েছেন একটি ‘পাখি ভ্যান’। এখন তার সংগ্রাম সেই লোন শোধ করা আর ভবিষ্যতে একটু জমির ব্যবস্থা করা।
রাশিদার আক্ষেপ নেই, কিন্তু একরাশ অভিমান আছে। ১৮ বছরে তার ভাগ্যে জোটেনি কোনো সরকারি সাহায্য, ১০ কেজি চালের কার্ড বা আশ্রয়ণের একটি ঘর। জনপ্রতিনিধিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও তালিকায় তার নাম ওঠেনি। চেয়ারম্যান-মেম্বাররা নাকি মনে করেন, রাশিদা তো ‘ভালোই আছেন’।
রাশিদা এখন রাস্তার পাশের সরকারি জায়গায় কুঁড়েঘর বেঁধে থাকেন। রৌদ্র-বৃষ্টির সাথে তার নিত্য মিতালি। বয়স ৪৫ ছুঁইছুঁই হলেও তার সংকল্প এখনো অটুট। তিনি বলেন, কারো কাছে হাত পেতে নেওয়ার চেয়ে আল্লাহ যেন শরীর সুস্থ রাখে, কাজ করে খেতে পারি।
রাশিদা কোনো সুন্দরী নারী নন, নেই কোনো জাঁকজমকপূর্ণ পরিচয়। কিন্তু তার এই অবিরাম ছোটাছুটি আমাদের এক অন্য সংগ্রামের গল্প শোনায়। যখন সমাজের অনেক সুবিধাভোগী মানুষ অলস সময় পার করেন, তখন আলমডাঙ্গার এক প্রত্যন্ত অঞ্চলের রাশিদা আমাদের শিখিয়ে দেন—বেঁচে থাকার নামই হলো নিরন্তর যুদ্ধ। ট্রেনের হুইসেল বাজলেই শুরু হয় যার নতুন দিন, সেই রাশিদারাই হয়তো আমাদের সমাজের আসল বীরাঙ্গনা।