নিজস্ব প্রতিবেদক
ছবি: এ আই প্রণীত
বাংলা পঞ্জিকা মতে আজ পহেলা আষাঢ়, বর্ষাকালের আনুষ্ঠানিক শুরু। যদিও মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি আগেই শুরু হয়েছে, এরপরেও প্রকৃতিতে এখনো রয়ে গেছে জ্যৈষ্ঠের তীব্র গরমের উত্তাপ।
আবহাওয়ার পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে, আজ সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে রংপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং রাজশাহী, ঢাকা, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ী দমকা হাওয়া ও বিজলি চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রবৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারি থেকে অতিভারি বর্ষণের সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে এই সময়ে সারা দেশে দিন এবং রাতের তাপমাত্রা সামান্য বৃদ্ধি পেতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস।
আষাঢ়ের প্রথম দিন আর কদম ফুল—এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই মূলত বাঙালি খোঁজে বর্ষার চিরন্তন রূপ। আকাশের নীল বিস্তারে ধীরে ধীরে জমে ওঠা কালো মেঘের দল আর দূর-দিগন্তের মৃদু গর্জন জানান দেয় বর্ষার প্রথম ডাক। দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বঙ্গোপসাগর থেকে জলীয় বাষ্প ভরা মেঘমালা দেশের আকাশ ঢেকে ফেলে। আবহাওয়াবিদদের ভাষায় যা প্রাকৃতিক জলবায়ুগত প্রক্রিয়া, সাধারণ মানুষের কাছে তা-ই প্রথম বৃষ্টির সোঁদা গন্ধ, কদম ফুলের হাসি আর টিনের চালে বৃষ্টির ছন্দ।
বর্ষা মানেই প্রকৃতির এক অদ্ভুত রূপান্তর। তপ্ত রোদ আর ধুলোবালির আস্তরণ ধুয়ে-মুছে চারপাশ তখন হয়ে ওঠে সতেজ ও সবুজ। শুধু কদম নয়, বর্ষা নিজেকে মেলে ধরে আরও কত শত ফুলে! কেয়া, কামিনী, জুঁই, গন্ধরাজ, হিজলের সুবাসে মুখরিত হয় চারপাশ, বিলে বিলে ফোটে শাপলা আর পদ্ম। খাল-বিল, নদী-নালা, হাওর ও জলাভূমি বর্ষার পানিতে প্রাণ ফিরে পেলে শুকিয়ে যাওয়া মাঠঘাটে শুরু হয় সবুজের সমারোহ।
বাংলার কৃষিভিত্তিক সভ্যতা ও অর্থনীতির জন্য এই বর্ষা এক পরম আশীর্বাদ। আমন ধানের চাষ, পাট উৎপাদন এবং মাছের প্রজননে এর ভূমিকা অপরিসীম। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মতে, দেশের মোট খাদ্য উৎপাদনের একটি বড় অংশ এই মৌসুমি বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দীর্ঘ সময় বৃষ্টিহীনতা কিংবা স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির মতো চরম প্রবণতা কৃষি ও জনজীবনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
মধ্যযুগের পদাবলী থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বর্ষার গান, কাজী নজরুল ইসলামের মেঘ-বৃষ্টির কবিতা কিংবা জীবনানন্দ দাশের প্রকৃতিচিত্র—সবখানেই বর্ষা মিশে আছে অবিনাশী এক অনুভূতির নাম হয়ে। নদীমাতৃক এই দেশের মানুষের স্মৃতি, নৌকাবাইচ ও লোকসংস্কৃতিতে বর্ষা এক জীবন্ত উপস্থিতি।
অবশ্য নগরজীবনে বর্ষার অভিজ্ঞতা অনেক সময় ভিন্ন রূপ নেয়। ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে কয়েক ঘণ্টার টানা বর্ষণেই তৈরি হয় জলাবদ্ধতা, যানজট ও নাগরিক দুর্ভোগ। জল নিষ্কাশন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতায় বর্ষা অনেক সময় স্বস্তির বদলে ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তবুও সব মিলিয়ে গরমের উত্তাপ, বৃষ্টির পূর্বাভাস আর জলবায়ুর পরিবর্তনের দোলাচলের মাঝেই শুরু হলো প্রকৃতির এই অনন্য ঋতুর পথচলা। দগ্ধ মাটিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার করে বর্ষা যেন শেষ পর্যন্ত মানুষের স্মৃতি, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের গভীরে পুনর্জন্মের গল্পই বুনে যায়।