তারে জড়িয়ে মাঠে পড়ে আছে একটি হাতি ছবি: সংগৃহীত
শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার নাকুগাঁও স্থলবন্দরের কাছে গারো পাহাড়ের বন ঘেঁষে থাকা ধানি জমিতে বন্য হাতি মারতে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে জেনারেটরের সাহায্যে বৈদ্যুতিক ফাঁদ পেতেছে স্থানীয় কিছু বাসিন্দা। গত বৃহস্পতিবার এমনই একটি তামার তৈরি জিআই তারের বৈদ্যুতিক ফাঁদে জড়িয়ে একটি হাতি গুরুতর আহত হয়ে লুটিয়ে পড়লে, তা দেখে উপস্থিত লোকজনকে উল্লাস করতে দেখা গেছে। বন্য হাতিটির ওপর এমন নৃশংসতার একটি ভিডিওচিত্র সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
বন্য প্রাণীর প্রতি সংবেদনশীল স্থানীয় নাগরিক ও বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, হাতি তাড়ানোর নামে এক কিলোমিটারজুড়ে এই মরণফাঁদ পাতা হয়েছে। তবে এসব ফাঁদ উচ্ছেদ করতে গিয়ে স্থানীয়দের বাধার মুখে পড়ছেন বনকর্মীরা। নালিতাবাড়ী উপজেলার বন বিভাগের রেঞ্জ অফিসার দেওয়ান আলী অভিযোগ করেন, নোয়াবিল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান এবং স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. মান্নান স্থানীয়দের প্ররোচিত করে বনকর্মীদের ওপর হামলা চালিয়েছেন এবং তাদের অবরুদ্ধ করে রেখেছিলেন।
বৃহস্পতিবারের ওই হাতি হত্যাচেষ্টার সময় ঘটনাস্থলে ইউপি চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান ও ইউপি সদস্য মো. মান্নান ছাড়াও ‘এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমে’র (ইআরটি) সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। ইআরটি সদস্যদের অভিযোগ, স্থানীয়দের বাধার কারণে তাঁরা হাতিটিকে নিরাপদে বনে ফেরাতে কাজ করতে পারেননি।
তবে নোয়াবিল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান তার সহযোগিতায় বৈদ্যুতিক সংযোগ দেওয়ার এবং বনকর্মীদের ওপর হামলার বিষয়টি অস্বীকার করে দাবি করেন, কৃষকেরা ধান বাঁচাতে জেনারেটর দিয়ে আলো জ্বালান এবং মাঝেমধ্যে তারে সংযোগ দেন। এ বিষয়ে কথা বলতে ইউপি সদস্য মো. মান্নানকে ফোন করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।
রেঞ্জ অফিসার দেওয়ান আলী জানান, বন্য প্রাণী ফসলের ক্ষতি করলে সরকার ক্ষতিপূরণ দেয়। গত সপ্তাহেও ৮ লাখ ৫৯ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কারণে স্থানীয় কৃষকেরা তাৎক্ষণিক ক্ষতিপূরণ চান, যা আইন হাতে তুলে নেওয়ার পেছনে কাজ করছে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত নেত্রকোনা, শেরপুর, ময়মনসিংহ ও জামালপুর অঞ্চলে ৩২টি হাতি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। অথচ এই দীর্ঘ সময়ে এসব ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে মাত্র সাতটি এবং থানা ও বন আদালতে মামলা হয়েছে মাত্র একটি করে।
পুরো দেশজুড়ে গত এক দশকে ১৪৬টি হাতি মারা গেছে, যার মধ্যে ২৬টি হাতিকে হত্যা করা হয়েছে এই বৈদ্যুতিক ফাঁদ পেতে। শেরপুর ছাড়াও জামালপুর, ময়মনসিংহ, রাঙামাটি, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে এই নিষ্ঠুর পদ্ধতির ব্যবহার আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে। ২০১৬ সালে আইইউসিএনের জরিপে দেশে হাতির সংখ্যা ছিল মাত্র ২৬৮টি।
সম্প্রতি সংসদে পাস হওয়া ‘বন্য প্রাণী (নিরাপত্তা ও সংরক্ষণ) আইন-২০২৬’ অনুযায়ী, হাতিকে পরিবেশের সূচক (ফ্ল্যাগশিপ স্পেসিস) হিসেবে সর্বোচ্চ সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। আইন অনুযায়ী, হাতি হত্যা একটি আমলযোগ্য এবং সম্পূর্ণ অজামিনযোগ্য অপরাধ।
লাইসেন্স ছাড়া হাতি হত্যা করলে প্রথমবার অপরাধের জন্য সর্বনিম্ন দুই থেকে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন ১ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। একই অপরাধ দ্বিতীয়বার করলে অপরাধীর সর্বোচ্চ ১২ বছরের কারাদণ্ড এবং ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের কঠোর বিধান কার্যকর হবে। এছাড়া আইনের ৩৭ ধারা অনুযায়ী, সন্দেহভাজন অপরাধীকে আদালতের পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে বন কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও হাতিবিশেষজ্ঞ এম এ আজিজ বলেন, "কৃষকের কষ্টের ফসল যেমন বাঁচাতে হবে, তেমনি হাতিকেও রক্ষা করতে হবে। শেরপুরে বনাঞ্চলের তুলনায় হাতির সংখ্যা বেশি হলেও বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি মনোযোগের অভাব রয়েছে। শুধু কোনো ঘটনা ঘটলে পদক্ষেপ না নিয়ে, স্থানীয়দের বছরব্যাপী সচেতন করা এবং ইআরটি সদস্যদের সক্ষমতা বাড়াতে বন বিভাগকে নিয়মিত কাজ করতে হবে।