নিজস্ব প্রতিবেদক
ছবি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি
১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ যশোরের টাউন হল ময়দানে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর দ্বাদশ জাতীয় সম্মেলনে দুটি শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরিত হয়। এতে ১০ জন সংস্কৃতিকর্মী নিহত হন এবং আড়াই শতাধিক মানুষ আহত হন। বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এটিই ছিল প্রথম বড় ধরনের নাশকতামূলক হামলা। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে দেশে নৈরাজ্যবাদীদের এক নতুন ও ভয়ানক অধ্যায় শুরু হয়।
উদীচী হামলার কয়েক মাস পরই ৮ অক্টোবর ১৯৯৯ তারিখে খুলনার নিরালা এলাকায় আহমদিয়া মসজিদে জুমার নামাজের সময় রিমোট কন্ট্রোল দিয়ে বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এই হামলায় ৮ জন মুসল্লি নিহত হন এবং বহু মানুষ আহত হন। ধর্মীয় উপাসনালয়ে এ ধরনের হামলা জনমনে ব্যাপক আতঙ্কের সৃষ্টি করে।
২০০১ সালের ৩ জুন গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার বানিয়ারচর ক্যাথলিক গির্জায় রবিবারের সাপ্তাহিক প্রার্থনা চলাকালীন শক্তিশালী বোমা হামলা চালানো হয়। এই নারকীয় ঘটনায় ১০ জন ভক্ত প্রাণ হারান। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপাসনালয়ে এই হামলা ছিল ধর্মীয় উগ্রবাদের চরম বহিঃপ্রকাশ।
একই বছরের ১৪ এপ্রিল অর্থাৎ ১৪০৮ বঙ্গাব্দের ১লা বৈশাখ রমনা বটমূলে ছায়ানটের ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলা চালানো হয়। এতে ১০ জন সাধারণ মানুষ নিহত হন। বাঙালির প্রাণের উৎসবে এই হামলা দেশবাসীকে স্তব্ধ করে দেয়।
২০০১ সালের ১৬ জুন নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ায় আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে বোমা হামলায় ২০ জন রাজনৈতিক কর্মী নিহত হন। এই হামলায় বহু মানুষ হাত-পা হারিয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেন। এটি ছিল রাজনৈতিক নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে চালানো অন্যতম বড় হামলা।
২০০২ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার রক্সি সিনেমা হল এবং পার্শ্ববর্তী একটি সার্কাস প্যান্ডেলে প্রায় একই সময়ে সিরিজ বোমা হামলা চালানো হয়। এই হামলায় ৩ জন নিহত এবং শতাধিক ব্যক্তি আহত হন। সাধারণ মানুষের বিনোদনের জায়গাকে লক্ষ্যবস্তু করার এই প্রবণতা সমাজে ভীতির সঞ্চার করে।
২০০২ সালের ৭ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের চারটি সিনেমা হলে (অজন্তা, অলকা, ছায়াবাণী ও মোনালিসা) অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে প্রায় একই সময়ে বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এই ঘটনায় অন্তত ২৭ জন নিহত হন এবং অসংখ্য মানুষ আহত হন। জনাকীর্ণ স্থানে এমন হামলা ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের অংশ।
২০০৪ সালের ২১ মে সিলেটের হযরত শাহজালাল (র.) মাজারে তৎকালীন ব্রিটিশ হাই কমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। এই হামলায় ৩ জন নিহত হন এবং হাই কমিশনারসহ অনেকে আহত হন। এটি ছিল কোনো বিদেশি কূটনীতিকের ওপর বাংলাদেশে প্রথম বড় ধরনের হামলা।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের জনসভায় তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ভয়াবহ আর্জেস গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। এতে আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন এবং কয়েকশ মানুষ স্প্লিন্টারের আঘাতে মারাত্মকভাবে আহত হন।
২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট জেএমবি দেশের ৬৩টি জেলার প্রায় ৫০০ স্থানে আধঘণ্টার ব্যবধানে সিরিজ বোমা হামলা চালিয়ে তাদের শক্তির প্রদর্শন করে।
২০০৫ সালের ১৪ নভেম্বর ঝালকাঠিতে বিচারকদের বহনকারী গাড়িতে বোমা হামলা চালিয়ে দুই সিনিয়র সহকারী জজ জগন্নাথ পাঁড়ে ও সোহেল আহমেদকে হত্যা করা হয়। বিচার বিভাগকে ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে এই হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছিল।
২০০৫ সালের ২৯ নভেম্বর গাজীপুর বার সমিতি এবং চট্টগ্রামের আদালত চত্বরে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালানো হয়। এতে আইনজীবী ও সাধারণ মানুষসহ ৯ জন নিহত হন। আত্মঘাতী হামলার এই নতুন ধরন বাংলাদেশের জন্য এক নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করে।