মুর্শিদুল আজিম হিরু
চেয়ার বেঞ্চের বিনিময়ে বিকিয়ে দেয়া হচ্ছে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যত
নিষিদ্ধ গাইড বিপননে যশোরের প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ওপেন সিক্রেট। স্কুল থেকে ছাত্রদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে ছাপা সিলেবাস। সেখানে সহায়ক বই হিসেবে সুকৌশলে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে নির্দিষ্ট কিছু প্রকাশনা সংস্থার নাম, যারা বাজারে শুধুমাত্র গাইড বই বিক্রি করে থাকে। শুধু সিলেবাসে নাম লেখাই শেষ নয়, সংশ্লিষ্ট প্রকাশনীর সরবরাহ করা প্রশ্নপত্র দিয়েই নেওয়া হয় অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা। পরীক্ষার প্রশ্নগুলোর প্রায় সবটাই হুবহু তুলে দেওয়া হয় ওই সংস্থার গাইড বই থেকে, যাতে শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট সেই বইটি কিনতে উদ্বুদ্ধ হয়। এই চিত্র কোনো একটি বিশেষ স্কুলের নয়, বরং যশোরের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরই বর্তমান বাস্তবতা। এর পেছনে রয়েছে মোটা অঙ্কের অনৈতিক লেনদেন। এই বাণিজ্যে টাকার অঙ্ক যত বাড়ছে, বাজারে গাইডের দামও তত বৃদ্ধি পাচ্ছে। মূলত অভিভাবকদের পকেট কেটে নিষিদ্ধ বই পড়িয়েই মাঠ পর্যায়ে চালানো হচ্ছে পাঠদান কার্যক্রম। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিশেষ করে ইংরেজি গ্রামার, বাংলা ব্যাকরণ ও সহায়ক বইয়ের ক্ষেত্রেই এই অনৈতিক সিন্ডিকেট সবচেয়ে বেশি সক্রিয়।
অথচ দেশে সব ধরনের গাইড বই ও নোটবই সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ১৯৮০ সালের 'নোটবুকস প্রোহিবিশন অ্যাক্ট' অনুযায়ী গাইড বই তৈরি, মুদ্রণ বা বিক্রি করা দণ্ডনীয় অপরাধ। পরবর্তীতে উচ্চ আদালতও সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতিতে গাইড বইয়ের ব্যবহার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেন। তবে মাঠ পর্যায়ে এই আইনের কোনো কার্যকর প্রয়োগ চোখে পড়ছে না।
আইন অমান্যের এই সামগ্রিক চিত্রে একটি বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছে যশোর (ঈদগাহ) বাদশাহ ফয়সল ইসলামী ইনস্টিটিউট। এই প্রতিষ্ঠানে অনিয়মের চিত্রটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও বিস্তৃত। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রথমে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নির্দিষ্ট প্রকাশনীর গাইড বই কেনা বাধ্যতামূলক করে। এর কিছুদিন পর অন্য আরেকটি প্রকাশনী সংস্থার সাথে অনৈতিক সমঝোতায় জড়ায় স্কুল কর্তৃপক্ষ। তখন আগের বই বাদ দিয়ে আবার নতুন আরেকটি গাইড কেনার নির্দেশনা দেওয়া হয়। বাজারে একেকটি গাইডের মূল্য প্রায় ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা। একই বিষয়ের পেছনে দুইবার টাকা ঢালতে গিয়ে সাধারণ অভিভাবকদের পকেট খালি হচ্ছে। শত শত অভিভাবক এখন এই অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের শিকার। শ্রেণিকক্ষে মূল পাঠ্যবই পড়ানোর কোনো বালাই নেই। শিক্ষকেরা ক্লাসে মূল বই একপাশে সরিয়ে রাখছেন। গাইড দেখে শুধু মডেল প্রশ্ন মুখস্থ করানো হচ্ছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা প্রকৃত শিক্ষা থেকে মারাত্মকভাবে বঞ্চিত হচ্ছে।
স্কুলটিতে চলমান অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা পরিচালনায় চরম অব্যবস্থাপনা ও জালিয়াতি প্রকাশ পেয়েছে। বিদ্যালয়টির নিজস্ব কোনো প্রশ্নপত্র নেই। অনুপম প্রকাশনীর মাধ্যমে অন্য স্কুল থেকে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করে পরীক্ষা চালানো হচ্ছে। পরীক্ষার প্রশ্নে ইনস্টিটিউটের নামের পাশে ব্র্যাকেটে ‘আবা’ লেখা রয়েছে। এই ‘আবা’ লেখা দেখেই স্পষ্ট বোঝা যায় এটি অন্য স্কুল থেকে ধার করা প্রশ্ন। ধার করা এই প্রশ্নপত্রের প্রতিটি বিষয়ে রয়েছে অসংখ্য বানান ও বিষয়গত ভুল। এমনকি প্রশ্নপত্রে খোদ ‘বাদশাহ ফয়সল ইসলামী ইনস্টিটিউট’ নামটিও ভুল বানানে ছাপা হয়েছে। এছাড়া বেশ কয়েকটি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো বাধ্যতামূলক প্রশ্ন রাখা হয়নি। অনেক প্রশ্ন করা হয়েছে যা নির্ধারিত সিলেবাসের সাথে একেবারেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে পরীক্ষা পরিচালনার ন্যূনতম মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক দিয়ে ক্লাস না করিয়ে খেয়ালখুশি মতো পাঠদান করানো হচ্ছে। এনটিআরসিএ থেকে সরকারিভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত বাংলা বিষয়ের একজন নিয়মিত শিক্ষক রয়েছেন। কিন্তু তাকে বাংলা ক্লাস নিতে দেওয়া হচ্ছে না, তাকে দিয়ে করানো হচ্ছে ভূগোলের ক্লাস। অন্যদিকে খণ্ডকালীন (পার্ট-টাইম) শিক্ষক দিয়ে চালানো হচ্ছে বাংলার মতো গুরুত্বপূর্ণ ও আবশ্যিক বিষয়ের ক্লাস। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার মান দিন দিন তলানিতে গিয়ে ঠেকছে।
অভিভাবকেরা জানান, এই অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে বা প্রশ্ন তুলতে সাহস পান না। প্রতিবাদ করলেই শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়।
অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আমজাদ হোসেন প্রথমে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। পরে তিনি বলেন, "কয়েকজন অভিভাবক ও শিক্ষার্থী কিছু বিষয়ে অভিযোগ করেছেন। পরীক্ষা পরিচালনার জন্য আমাদের একটি কমিটি রয়েছে, বিষয়টি নিয়ে তাদের সাথে আলোচনা করা হয়েছে।"
প্রকাশনী সংস্থার কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি দাবি করেন, "কোনো কোম্পানির কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়নি। তবে তারা বিদ্যালয়ে কিছু চেয়ার-টেবিল দেওয়ার কথা বলেছিল।" প্রশ্নপত্রে অসংখ্য ভুল থাকার বিষয়টি স্বীকার করে নিয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বলেন, "ভবিষ্যতে আমরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নিজেরাই প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও ছাপিয়ে পরীক্ষা সম্পন্ন করব।"