সাইফুল ইসলাম
বাজারহাটের চামড়া হাট ছবি: ধ্রুব নিউজ
যশোরের রাজারহাট। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সর্ববৃহৎ পশুর চামড়ার এই হাটটিতে পা রাখলে একসময় কোটি কোটি টাকার ব্যবসার গুঞ্জন শোনা যেত। কিন্তু গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সেই চিরচেনা জৌলুস উধাও। বিগত সরকারের আমলে পরিকল্পিতভাবে ধস নামানো এই শিল্পটি এখন শুধু টিকে থাকার লড়াই করছে। আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দীর্ঘদিনের সেই মন্দা কাটিয়ে এবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন হাটের ব্যবসায়ীরা। তবে সেই স্বপ্নের পেছনে লুকিয়ে আছে এক বুক আশঙ্কা, ঋণের বোঝা আর অদৃশ্য সিন্ডিকেটের গল্প।
হাটের এক কোণে মলিন মুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন যশোর সদর উপজেলার ক্ষুদ্র চামড়া ব্যবসায়ী আব্দুল হামিদ। বংশপরম্পরায় এই ব্যবসার সাথে যুক্ত হামিদ গত কয়েক বছরে হারিয়েছেন পৈত্রিক জমিজমা আর জীবনের সব সঞ্চয়। লোকসানের বৃত্ত থেকে বের হতে গত বছর ১ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে চামড়া কিনেছিলেন। কিন্তু লাভ তো দূরের কথা, ট্যানারি মালিকদের কাছে আটকে থাকা সেই আসল টাকাই এখনও তুলতে পারেননি। এবার সেই লোকসান পোষানোর মরিয়া চেষ্টায় সমিতি থেকে আবারও ১ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন। বুকভরা আশঙ্কা নিয়ে হামিদ বলেন, "চামড়ার জগৎ থেকেই তো আমরা হারায়ে গেলাম। ৩০-৩৫ টাকা ফুট চামড়া বিক্রি হচ্ছে, তাও আমরা ক্ষুদ্র পার্টিরা কিনবো কী করে? আমরা তো শেষ হয়ে গেলাম।"
হামিদের মতো মাঠপর্যায়ের শত শত ক্ষুদ্র ও মৌসুমী ব্যবসায়ীর গল্পটা একই রকম। তাদের অভিযোগ, ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেটের কারণে প্রতি বছর কোরবানির ঈদ এলেই চামড়ার দাম রহস্যজনকভাবে কমে যায়। বর্তমানে বাজারের প্রকারভেদে প্রতি ফুট চামড়া ১৫ থেকে ৫৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, যা মাত্র দুই মাস আগের তুলনায় ফুটপ্রতি অন্তত ১০ টাকা কম। একদিকে দাম কমছে, অন্যদিকে বাড়ছে খরচ। এক মাসের ব্যবধানে চামড়া সংরক্ষণের প্রধান উপাদান লবণের দাম বস্তাপ্রতি ৮৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৯০০-৯৫০ টাকায় ঠেকেছে। এর সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে পরিবহন খরচও।
অন্য এক চামড়া ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে আমরা কোনো পেমেন্ট পাচ্ছি না। চলমান আন্তর্জাতিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে যদি চামড়া বিদেশে রপ্তানি ব্যাহত হয়, তবে ব্যবসায়ীরা চরম বিপর্যয়ে পড়বেন। ট্যানারি মালিকরা যদি কোরবানির আগে আমাদের সম্পূর্ণ টাকা বুঝিয়ে দেন, তবেই আমরা ব্যাপক আকারে চামড়া কেনার প্রস্তুতি নিতে পারবো।"
ব্যবসায়ীদের এই সংকটের পেছনে বিগত সরকারের 'ফ্যাসিবাদী' নীতিকেই দায়ী করছেন রাজারহাট চামড়ার হাটের নতুন ইজারাদার রাজু আহমেদ। প্রায় অর্ধ কোটি টাকা দিয়ে এবারের হাট ইজারা নিয়েছেন তিনি। এক বুক দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাজু আহমেদ বলেন, "বিগত ১৭ বছরের সরকার পরিকল্পিতভাবে এই শিল্পটাকে ধ্বংস করেছে। এক সময়ের কোটি কোটি টাকার এই হাটের বড় বড় ব্যবসায়ীরা আজ নিঃস্ব হয়ে কেউ রাস্তায় চা বিক্রি করছেন, কেউ ইজিবাইক চালাচ্ছেন। তবে নতুন সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা অনেক।"
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ইরান-আমেরিকা-ইসরাইল যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে কেমিক্যালের দাম ৩০ হাজার টাকা থেকে এক লাফে ২ লাখ ৩০ হাজার টাকায় ঠেকেছে। এই বৈশ্বিক সংকট ট্যানারি মালিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন করে দামের সংশয় ও আতঙ্ক তৈরি করেছে। তা সত্ত্বেও দেশের অন্যতম প্রধান এই রাজস্ব আয়ের খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে সরকারের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
হাটের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সহ-সভাপতি গিয়াসউদ্দিন বলেন, "কোরবানির সময় চামড়ার দাম কমে যাওয়ার পেছনে এক অদৃশ্য সিন্ডিকেট কাজ করে। বর্তমানে খারাপ চামড়া ১৫ টাকা এবং ভালো চামড়া ৪০ টাকা ফুট বিক্রি হচ্ছে। চামড়া ব্যবসার মূল সমস্যা হলো পেমেন্ট। ব্যবসায়ীদের হাতে টাকা থাকলে চামড়ার দাম এমনিতেই বেড়ে যায়। তাই আমাদের মূল আশা এখন নতুন সরকারের ওপর।"
দক্ষিণবঙ্গের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র রাজারহাটের এই ঐতিহ্যবাহী চামড়া শিল্পকে বাঁচাতে এখন প্রয়োজন একটি সমন্বিত বাজার ব্যবস্থাপনা। সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ এবং ট্যানারি মালিকদের কাছে আটকে থাকা বকেয়া টাকা আদায়ে নতুন অন্তর্বর্তীকালীন ও গণতান্ত্রিক সরকারের দ্রুত ও দায়িত্বশীল হস্তক্ষেপই এখন এই অঞ্চলের হাজারো মানুষের একমাত্র ভরসা।