ধ্রুব ডেস্ক
জীবন বাঁচাতে চার-পাঁচটি ধানক্ষেত জুড়ে দৌড়েও শেষ রক্ষা হয়নি স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনের (১৪)। কুমিল্লার লালমাই উপজেলায় নিখোঁজের চার দিন পর ফসলি জমি থেকে ওই কিশোরীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় দায়ের হয়েছে হত্যা মামলা। তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পেরেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।
নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়েছিল তাজমিন। এতদিন ফোনে যোগাযোগ করা হলে সে বান্ধবীর বাসাতেই অবস্থান করছে বলে জানিয়েছিল। তবে বুধবার গভীর রাতে তাজমিন তার বাবার মোবাইলে একটি জরুরি মেসেজ ও লাইভ লোকেশন পাঠায়, যেখানে তাকে দ্রুত এসে উদ্ধার করার আকুতি জানায় সে।
তাজমিনের বাবা আব্দুল আলিম জানান, বার্তাটি আসার সময় তিনি ঘুমে ছিলেন। ভোরে ঘুম থেকে উঠে মেসেজ ও লাইভ লোকেশন দেখে দ্রুত জগতপুর এলাকায় ছোটেন তিনি। তবে ততক্ষণে সেখানে পৌঁছে মেয়ের নিথর মরদেহ দেখতে পান।
এদিকে ঘটনাস্থলে পাওয়া আলামত নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন চাঞ্চল্য। মরদেহের আশপাশের চার থেকে পাঁচটি ধানক্ষেতে ধানগাছ দুমড়েমুচড়ে থাকার ও ব্যাপক দৌড়াদৌড়ির দাগ মিলেছে। পুলিশের ধারণা, ঘাতকদের হাত থেকে নিস্তার পেতে ও নিজের জীবন বাঁচাতে মাঠে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছিল তাজমিন।
বৃহস্পতিবার সকালে সড়কের পাশে পরিত্যক্ত উল্টানো অটোরিকশা দেখে স্থানীয়রা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল দিলে পুলিশ গিয়ে ধানক্ষেত থেকে গলায় গামছা প্যাঁচানো অবস্থায় তাজমিনের বিবস্ত্র মরদেহ উদ্ধার করে।
কুমিল্লার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সদর দক্ষিণ সার্কেল) মোস্তাইন বিল্লাহ্ জানিয়েছেন, প্রযুক্তিগত তদন্তে দেখা গেছে—৪ অক্টোবর তাজমিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া গিয়েছিল। সেখান থেকে ৫ অক্টোবর কুমিল্লা ফিরে ভোররাতে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হয়।
পরবর্তীতে ৭ অক্টোবর দুপুরে কক্সবাজার থেকে রওনা হয়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে কুমিল্লা নগরের পদুয়ার বাজার নূরজাহান হোটেলের সামনে এসে নামে সে। সেখান থেকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চড়ে সে গন্তব্যে রওনা হয়েছিল। ঘটনাস্থলে উদ্ধার হওয়া অটোরিকশা ও ভ্যানিটি ব্যাগটি নিয়ে তদন্ত চলছে, যদিও ভ্যানিটি ব্যাগটি তাজমিনের নয় বলে দাবি পরিবারের। অন্যদিকে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের পর স্কুলে তাজমিনের কোনো হাজিরা ছিল না বলে জানিয়েছেন ফরিদা বিদ্যায়তনের প্রধান শিক্ষক।
লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানুর রহমান জানান, তাজমিনকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করে মরদেহ মাঠে ফেলে রাখা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
এ ঘটনায় তাজমিনের বাবা বাদী হয়ে লালমাই থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।
নিহত তাজমিন কুমিল্লা নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী এবং একটি ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের কর্মী আব্দুল আলিমের মেয়ে। তাদের বাড়ি যশোরের চুড়ামনকাটি ছাতিয়ানতলায়। পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকত।
মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে স্বজনরা গ্রামের বাড়ি যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলায় নিয়ে আসা হয়েছে। সেখানেই তাকে দাফন করা হবে। উদ্ধারকৃত অটোরিকশার সূত্র ধরে ঘাতকদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক দল অভিযানে রয়েছে।