সংস্কৃতি ডেস্ক
মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ ছবি: সংগৃহীত
বিখ্যাত ‘বিট জেনারেশন’-এর পুরোধা ব্যক্তিত্ব, সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের অনন্য প্রতীক মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের আজ শততম জন্মদিন। ১৯২৬ সালের ৩ জুন জন্ম নেওয়া এই কালজয়ী কবিকে তাঁর জন্মশতবার্ষিকীতে গভীর মমতায় স্মরণ করছে বিশ্বসাহিত্য অঙ্গন এবং বিশেষ করে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সাথে এই খ্যাপাটে, উন্মাতাল ও স্বাধীন ব্যক্তিসত্তার কবির এক অবিচ্ছেদ্য আবেগঘন সম্পর্ক জড়িয়ে রয়েছে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধের সময় এ দেশের মানুষের ওপর নেমে আসা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মমতা ও শরণার্থীদের অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশা নিজের চোখে দেখতে এসেছিলেন অ্যালেন গিন্সবার্গ। একাত্তরের সেপ্টেম্বর মাসে কলকাতা থেকে যশোর রোডে গিয়ে শরণার্থীদের দুরবস্থা দেখে তিনি লিখেছিলেন তাঁর ইতিহাসের সেই কিংবদন্তি দীর্ঘ কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ (September on Jessore Road)। পরবর্তীতে এই কবিতায় সুর দিয়ে তিনি নিজেই গান গেয়েছেন। তাঁর এই একটি কবিতার মধ্য দিয়েই বিশ্বসাহিত্যের কোটি পাঠকের কাছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং শরণার্থীদের আর্তনাদ আজীবন সরব হয়ে রয়েছে।
খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসে প্রায় আট বছর ধরে এই মার্কিন কবির ক্যামেরা বন্দি করেছেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন। তিনি জানান, গিন্সবার্গ শুধু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেই শামিল হননি, বরং বাংলার বাউল দর্শন ও লালন সাঁইজির গানের প্রতিও তাঁর ছিল তীব্র অনুরাগ। বাংলাদেশ থেকে সংগৃহীত লালন শাহের ইংরেজি অনুবাদের বই ‘সংস অব লালন শাহ’ (Songs of Lalon Shah) উপহার পাওয়ার পর কবি অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত হয়েছিলেন। লালনের দর্শনে গভীরভাবে প্রভাবিত হয়ে অ্যালেন গিন্সবার্গ পরবর্তীতে ‘আফটার লালন’ (After Lalon) শিরোনামে কয়েকটি দুর্দান্ত কবিতা লিখেছিলেন এবং তা নিজের কণ্ঠে রেকর্ডও করেছিলেন। শুধু তাই নয়, নিজের নিউইয়র্কের গ্রিনিচ ভিলেজের অ্যাপার্টমেন্টের দেয়ালে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথা ঝুলিয়ে রেখেছিলেন এই বিট কবি।
অ্যালেন গিন্সবার্গ তৎকালীন মার্কিন সমাজ ও রাজদরবারের বৃত্ত থেকে সাহিত্যকে ছিনিয়ে এনে জনতার রাস্তায় স্থাপন করেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ–পরবর্তী তরুণ প্রজন্মকে তিনি শিখিয়েছিলেন কীভাবে স্বাধীন ব্যক্তিসত্তা ও মতামত ধরে রাখতে হয়। মেহনতি মানুষ ও গৃহহীনদের অধিকারের পক্ষে তিনি সবসময় কলম ধরেছেন।
১৯৯৭ সালের ৫ এপ্রিল নিউইয়র্কে এই মহান কবির মহাপ্রয়াণ ঘটে। ১৯৭১ সালের শরণার্থী শিবিরের স্মৃতিবিজড়িত তাঁর নিজের তোলা বহু ছবি ও নেগেটিভ হারিয়ে গেলেও, তাঁর ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ ও ‘আফটার লালন’ কবিতার মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে তিনি চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন।