নিজস্ব প্রতিবেদক
চিত্রশিল্পী ও ভাস্কর সমীর মজুমদারের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয়। ছবি: ধ্রুব নিউজ
শ্রদ্ধাঞ্জলি, নীরবতা পালন ও আলোচনা সভায় বক্তাদের আহ্বান— সমীরের শিল্পচেতনা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হবে
বাংলার মাটি, মানুষের সংগ্রাম এবং প্রগতিশীল শিল্পচেতনার উজ্জ্বল প্রতিনিধি, চিত্রশিল্পী ও ভাস্কর সমীর মজুমদারের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয়েছে। ৩১ মে তাঁর জন্মস্থান নড়াইল সদর উপজেলার আউড়িয়া গ্রামে দিনব্যাপী স্মরণানুষ্ঠান, শ্রদ্ধাঞ্জলি ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
দুপুর ১টায় সমীর মজুমদারের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। পরে তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। অনুষ্ঠানে শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন।
প্রয়াত শিল্পীর সহধর্মিণী বিপুলা রানী মজুমদারের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় বক্তারা সমীর মজুমদারের জীবন ও কর্মের ওপর আলোকপাত করেন। বক্তারা বলেন, বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের অন্যতম ঘনিষ্ঠ শিষ্য হিসেবে সমীর মজুমদার দীর্ঘ প্রায় ৫৬ বছরের শিল্পসাধনার মধ্য দিয়ে নিজস্ব শিল্পভাষা নির্মাণ করেছিলেন।
তাঁর চিত্রকর্ম ও ভাস্কর্যে লোকজ ঐতিহ্য, শ্রেণিসচেতনতা এবং মানবিক মূল্যবোধের এক অনন্য সমন্বয় লক্ষ করা যায়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাঁর শিল্পকর্ম প্রশংসিত হয়েছে এবং শিল্পশিক্ষা বিস্তারেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন।
সমীর মজুমদার ছিলেন শিল্পকে মানুষের জীবনসংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করার এক অসাধারণ কারিগর। তাঁর শিল্পকর্মে বাংলার কৃষক, শ্রমিক, খেটে খাওয়া মানুষ, গ্রামীণ জনজীবন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বঞ্চিত মানুষের স্বপ্ন-সংগ্রাম শক্তিশালীভাবে উঠে এসেছে। তিনি শুধু একজন চিত্রশিল্পী নন, ছিলেন একজন সাংস্কৃতিক সংগ্রামী, যিনি শিল্পকে মানুষের মুক্তির ভাষা হিসেবে দেখতেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বক্তারা দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, সমীর মজুমদারের মতো একজন নিবেদিতপ্রাণ শিল্পীর অবদান এখনও যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয়নি। তাঁর শিল্পকর্ম, স্মৃতি ও আদর্শ সংরক্ষণে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি গবেষণা ও প্রকাশনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা।
সভায় আগামী বছরগুলোতে আরও বৃহত্তর পরিসরে “সমীর মজুমদার স্মরণমেলা” আয়োজনের ঘোষণা দেওয়া হয়। এ সময় বক্তারা তাঁর প্রতিষ্ঠিত স্মৃতি সংগ্রহশালা ও শিল্পচর্চার কেন্দ্রকে সংরক্ষণ ও বিকশিত করার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে স্মৃতি চারণ করে বক্তব্য রাখেন আমন্ত্রিত অতিথি শিল্পী, ফিল্মমেকার ও ক্রিটিক রেজাউর রহমান সবুজ, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব রেজাউল হক, চিত্রা থিয়েটারের সভাপতি সৈয়দ ওসমান আলী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব স্বপ্না রায়, লেখক ও চিন্তক ড. মহিউদ্দীন মোহাম্মদ, পটুয়া শিল্পী নিখিল চন্দ্র দাস, সাংস্কৃতিক কর্মী ও শিল্পবান্ধব খবির সিকদার।
দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ২০২৫ সালের ৩১ মে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় চিত্রশিল্পী সমীর মজুমদার মৃত্যুবরণ করেন। আজ তাঁর প্রয়াণের এক বছর পূর্ণ হলো। আজও তাঁর শিল্পকর্মে বেঁচে আছে বাংলার লাল মাটি, কৃষকের ঘাম, শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম এবং একটি মানবিক সমাজ নির্মাণের স্বপ্ন।
অনুষ্ঠানের শেষে সমীর মজুমদারের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে উপস্থিত সবাই তাঁর অসমাপ্ত শিল্প ও মানবিক স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।