ধ্রুব রিপোর্ট
যশোরের ঐতিহ্যবাহী ইনস্টিটিউটের ভূপতি মঞ্চে শনিবার (০৩ জানুয়ারি) বিকেলে 'রাষ্ট্র মহল' যশোরের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো বিশেষ রাষ্ট্র সংলাপ। এবারের আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল— "গ্রিস থেকে বায়তুল হিকমা: জ্ঞানের অনুবাদ, সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ এবং ইসলামী দর্শনের বিকাশ—আল-কিন্দি, আল-ফারাবিদের যুক্তি, অস্তিত্ব ও জ্ঞানচিন্তার ধারাবাহিকতা।"
অনুষ্ঠানের শুরুতেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের নক্ষত্র ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করা হয়। উপস্থিত আলোচক ও সুধী সমাজ তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নিরবতা পালন করেন।
কবি জাহিদ আককাজ-এর প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট কবি ও গবেষক সেলিম রেজা সেলিম। সংলাপে আলোচক হিসেবে অংশ নেন ব্যাংক কর্মকর্তা ও গবেষক মনিরুজ্জামান, কমরেড উজ্জ্বল বিশ্বাস এবং কবি মামুন আজাদ।
আলোচনার মূলপর্বে গবেষক মনিরুজ্জামান দার্শনিক আল কিন্দি’র জীবন ও আরব্য দর্শনে তার অনন্য অবদান নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, "আল কিন্দি কেবল একজন দার্শনিকই ছিলেন না, বরং তিনি আরব ভূখণ্ডে দর্শন চর্চার মজবুত ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন। বাগদাদের 'বায়তুল হিকমাহ' বা 'জ্ঞানগৃহ'কে উচ্চ পর্যায়ের জ্ঞানতাত্ত্বিক গবেষণার কেন্দ্রে পরিণত করতে তার ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। তিনি গ্রীক দর্শনের জটিল তত্ত্বগুলোকে আরব্য প্রেক্ষাপটে সহজবোধ্য করে তুলেছিলেন।"
কমরেড উজ্জ্বল বিশ্বাস ও কবি মামুন আজাদ তাদের বক্তব্যে আল-ফারাবির যুক্তিবিদ্যা, অস্তিত্ববাদ এবং সমাজ-রাষ্ট্র গঠনে দর্শনের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেন। তারা বলেন, মধ্যযুগে আরব দার্শনিকরা জ্ঞানের যে মশাল জ্বেলেছিলেন, তা পরবর্তী বিশ্ব সভ্যতার জন্য পাথেয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সভাপতির বক্তব্যে কবি ও গবেষক সেলিম রেজা সেলিম গ্রিক দর্শনের সঙ্গে আরবদর্শনের ঐতিহাসিক সংযোগ ও মিথস্ক্রিয়ার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, "প্লেটো ও অ্যারিস্টটলের দর্শন যখন ইউরোপীয় অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল, তখন আরবের দার্শনিকরাই তা পরম মমতায় সংরক্ষণ ও অনুবাদ করেছিলেন। আল কিন্দি ও আল ফারাবির মতো মনীষীদের মৌলিক রচনা ও অনুবাদের কারণেই গ্রিক দর্শন আজ পৃথিবীতে টিকে আছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এই আরব দার্শনিকদের হাত ধরেই পরবর্তীতে দর্শন ইউরোপে পুনর্জন্ম লাভ করে এবং আধুনিক বিশ্ব সভ্যতার বিকাশ ত্বরান্বিত হয়।"
যশোরের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার সুধীজন, লেখক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি একটি সার্থক জ্ঞানতাত্ত্বিক সংলাপে পরিণত হয়। অনুষ্ঠানের শেষলগ্নে বক্তারা জ্ঞানের এই বৈশ্বিক আদান-প্রদান ও দর্শন চর্চাকে তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান।