❒ ‘কল কল সুর তুলে ছুটে চলি আমরা তরঙ্গ’
শেখ জালাল
"সব কাজে চাই প্রতিযোগিতা, সব কাজে চাই পাল্লা / যখন যেখানে থাকবো সেখানে ভালো কাজ করবো..."— কচি কণ্ঠে এই সুমধুর গানের প্রতিধ্বনি যখন যশোর প্রেসক্লাবের শহীদ সাংবাদিক মাজেদ অডিটোরিয়াম ছাড়িয়ে বাইরে আসছিল, তখন পথচারীরাও থমকে দাঁড়াচ্ছিলেন। নার্সারিতে পড়া শিশু শিল্পী আরিজাতুল জান্নাতের এই পরিবেশনা কেবল গান ছিল না, ছিল একটি প্রজন্মের শুদ্ধ সংস্কৃতি চর্চার বহিঃপ্রকাশ।
সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘তরঙ্গ শিল্পীগোষ্ঠী’-র ২৫ বছর পূর্ণ করে ২৬ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে আজ শুক্রবার সকালে আয়োজিত হয় এক ব্যতিক্রমী অভিভাবক সমাবেশ ও ‘সিঙ্গেল ডিজিট’ সংবর্ধনা।
শূন্য থেকে মহীরুহ
২০০০ সালে ‘কল কল সুর তুলে ছুটে চলি আমরা তরঙ্গ’—এই স্লোগান নিয়ে একদল স্বপ্নবাজ তরুণের হাত ধরে যাত্রা শুরু হয়েছিল সংগঠনটির। শুরুর পথটা সহজ ছিল না। চরম আর্থিক সংকট আর মহড়ার জায়গার অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। কিন্তু শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে পিছু হটেননি উদ্যোক্তারা। আজ সেই ছোট্ট চারাগাছটি বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে যশোর শহরের মুজিব সড়কে অবস্থিত কার্যালয়ে সঙ্গীত, আবৃত্তি, তিলাওয়াত ও অভিনয়—এই ৪টি বিভাগে ১২০ জন শিল্পী নিয়মিত চর্চা করছেন।
প্রদীপ্ত নক্ষত্রদের আঁতুর ঘর
তরঙ্গ কেবল অনুষ্ঠান আয়োজনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, দেশবাসীকে উপহার দিয়েছে অসংখ্য গুণী শিল্পী। এই সংগঠন থেকেই উঠে এসেছেন:জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পী রোকনুজ্জামান, প্রখ্যাত শিল্পী মাহ্দী হাসান, শিশু সাহিত্যিক ও গীতিকার জুবায়ের হুসাইন, শিল্পী রিফাত আহমেদ হিমেল, আজহারুল ইসলাম প্রমুখ।
বিপথগামী প্রজন্মকে রক্ষার হাতিয়ার

অনুষ্ঠানে বর্তমান সময়ের কিশোর-কিশোরীদের নৈতিক অবক্ষয় ও মোবাইল আসক্তি বা নোমোফোবিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন বক্তারা। অভিভাবক আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, "সন্তানরা সারাক্ষণ ফোনে গেম খেলে। কিন্তু তরঙ্গের সাথে যুক্ত হওয়ার পর তাদের মধ্যে অদ্ভুত ইতিবাচক পরিবর্তন দেখছি।"
তরঙ্গের উপদেষ্টা জুবায়ের হোসাইন বলেন, "তরঙ্গ কেবল একটি সংগঠন নয়, এটি একটি আন্দোলন। সুরের ভেলায় চড়ে আমাদের সন্তানরা যেন আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে, সেই লক্ষ্যেই আমরা কাজ করছি।"
আরেক উপদেষ্টা গাজী মুকিত স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘২৫ বছর আগে সম্পান শিল্পীগোষ্ঠী থেকে আজকের তরঙ্গের জন্ম। আজ আমাদের এই সাফল্য আগামী ২৫ বছরের পথচলার শক্তি জোগাচ্ছে।’
.আগামীর লক্ষ্য
তরঙ্গ শিল্পীগোষ্ঠীর পরিচালক রিফাত আহমেদ হিমেল জানান তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা। তিনি বলেন, "আমরা আগামীতে একটি পূর্ণাঙ্গ কালচারাল স্কুল গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছি। যেখানে আধুনিক প্রযুক্তির সাথে মিশে থাকবে আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্য ও শুদ্ধ সংস্কৃতি।"

নান্দনিক পরিবেশনা ও সম্মাননা
আলোচনা সভার ফাঁকে ফাঁকে তরঙ্গের শিল্পীরা পরিবেশন করেন দেশাত্মবোধক গান ও হামদ-নাত। কৃত্রিমতাহীন মাটির সোঁদা গন্ধ মাখা সেই সুর পুরো মিলনায়তনে এক স্নিগ্ধ আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি করে। অনুষ্ঠান শেষে কৃতি শিল্পীদের মাঝে ‘সিঙ্গেল ডিজিট’ সংবর্ধনা স্মারক তুলে দেওয়া হয়।
সুস্থ সংস্কৃতি আর সঠিক আদর্শের সমন্বয়ে ‘তরঙ্গ’ হয়ে উঠুক প্রতিটি ঘরে ঘরে আলোর মশাল—এমনই প্রত্যাশা নিয়ে শেষ হয় এই রজতজয়ন্তী উৎসবের মিলনমেলা।