Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
শুক্রবার, ১ মে ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

মে দিবস : কৃষকের নেই শ্রমিক স্বীকৃতি

এম জামান এম জামান
প্রকাশ : শুক্রবার, ১ মে,২০২৬, ০৬:১২ এ এম
মে দিবস : কৃষকের নেই শ্রমিক স্বীকৃতি

ধানের বোঝা মাথায় বয়ে বেড়ালেও কৃষকের নেই কর্মঘণ্টা, বেতন, বেতন পেনশন; দাবি আদায়ে মিছি মিটিং ছবি: এম জামান

‘সব সাধকের বড় সাধক আমার দেশের চাষা’—পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের এই অমর পঙক্তিটি আমাদের হৃদয়ে নাড়া দিলেও বাস্তবতা মানলে প্রশ্ন জাগে, এই সাধকদের প্রকৃত শ্রমের মূল্য বা মর্যাদা আমরা কতটুকু দিতে পেরেছি? আজ ১ মে, মহান মে দিবস। বিশ্বজুড়ে যখন শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের গান গাওয়া হচ্ছে, রাজপথ রঞ্জিত হচ্ছে দাবি আদায়ের মিছিলে, তখন দেশের অন্যতম কৃষিপ্রধান অঞ্চল যশোরের বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠে এক ভিন্ন চিত্র দৃশ্যমান। এখানে মে দিবস আসে না, আসে না কোনো অধিকার আদায়ের বার্তা। আকাশজুড়ে কালো মেঘ আর কালবৈশাখীর শঙ্কার মাঝে কৃষি শ্রমিকরা ধান নিয়ে কাটাচ্ছেন ব্যস্ত সময়। অথচ শ্রমিকের সংজ্ঞায় তাদের নাম যেন আজও অস্পষ্ট।

যশোর জেলা কৃষিতে একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ জনপদ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, যশোরের দাপ্তরিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই জেলায় মোট কৃষক পরিবারের সংখ্যা ৪,৯৫,৩৪২টি। তবে সবচেয়ে অন্তরালের চিত্রটি হলো, এদের মধ্যে ৭২,৫৩৪টি পরিবার সম্পূর্ণ ভূমিহীন চাষী (১৪.৬৪%) এবং ১,৫৫,৫৩১টি পরিবার প্রান্তিক চাষী (৩১.৩৯%)। অর্থাৎ, যশোরের কৃষি কাঠামোর প্রায় ৪৬ শতাংশই সরাসরি অন্যের জমিতে শ্রম দিয়ে বা নামমাত্র জমিতে চাষাবাদ করে জীবিকা নিরবাহ করেন, যাদের প্রকৃত পরিচয় ‘কৃষি শ্রমিক’।  এদের নেই কোন দাফতরিক স্বীকৃতি। তাদের নেই কোন সংঘ বা ইউনিয়ন। নেই স্থায়ী কোন চাকরির ব্যবস্থা, বছরান্তে বা পৌঢ়ে নেই পেনশন। মে দিবসে যখন শ্রমিকরা ছুটি ভোগ করছে তখনওে কৃষি শ্রমিকরা মাঠে। সোনালী ফসল ঘরে তোলার লড়াই করছেন কৃষি শ্রমিকরা। চলতি মৌসুমে যশোর জেলায় প্রায় ১ লাখ ৫৭ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এই বিশাল ফসলের মাঠে কালবৈশাখী ও বৃষ্টি শঙ্কা। এরমধ্যে যতটুকু অবকাশ পাওয়া যায় তাতেই ধান তুলছে চায় কৃষকরা।

যশোর সদরের কেফায়েতনগর গ্রামের কৃষক মনসুর আলীর মতে, ধান ঘরে তোলা বড় চ্যালেঞ্জ। মে দিবস রিকসা ভ্যান, মোটর শ্রমিকদের। আমরা কি করবো।

ফুলবাড়ি মাঠে কর্মরত এক শ্রমিক জানান, বিরূপ পরিস্থিতির কারণে কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না, কিন্তু কাজ না কেৌ চলছে না। আমরা শ্রমিক না, আমরা তো জন। আমাদের দিনে কাজ দিনে আয়। কাজ না করলে কেউ খোঁজ নেয় না।

যশোরে আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ধান বা মাছ চাষের প্রসার ঘটলেও শ্রমিকের ভাগ্যোন্নয়নে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না। যশোরের কৃষি শ্রমিকরা সম্পূর্ণ অসংগঠিত। শিল্প-কলকারখানার শ্রমিকদের জন্য ট্রেড ইউনিয়ন থাকলেও কৃষি শ্রমিকদের জন্য কোনো নিবন্ধিত ইউনিয়ন নেই যারা মজুরি বৃদ্ধি বা কর্মপরিবেশ নিয়ে কথা বলবে। ফলে মে দিবসের আলোচনায় যখন আট ঘণ্টা কাজ বা নির্দিষ্ট ছুটির কথা আসে, কৃষি শ্রমিকের কাছে তা রূপকথা মাত্র। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিরূপ আবহাওয়ায় কাজ করার পরও তারা পান না কোনো বাড়তি রাষ্ট্রীয় সুবিধা।

২০২৪ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কৃষি শ্রমিকের গড় মজুরি পুরুষদের জন্য ৫৮৩ টাকা এবং নারীদের জন্য মাত্র ৪২৫ টাকা, যা বর্তমান বাজারদরের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। যশোরের মাঠে কর্মরত নারী শ্রমিকরা সমপরিমাণ কাজ করেও পুরুষের চেয়ে প্রায় ৩০ শতাংশ কম মজুরি পান। কৃষি কাজকে এখনো ‘দিনমজুরি’ হিসেবে দেখা হয়, ফলে তারা প্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকের মর্যাদা পান না। প্রচলিত শ্রম আইন মূলত কলকারখানা কেন্দ্রিক; কৃষি শ্রমিকদের ‘অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত’ হিসেবে গণ্য করায় তারা পেনশন বা বিমার মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত।

যশোর কৃষি অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোশাররফ হোসেনের তথ্যমতে, জেলার ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ধান কাটা ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। কৃষকদের দ্রুত ধান কেটে নিরাপদে ঘরে তোলার জন্য নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছে কৃষি বিভাগ। আবহাওয়া উন্নতির সম্ভাবনা থাকলেও হঠাৎ কালবৈশাখীর আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। প্রকৃতির এই অনিশ্চয়তার সঙ্গেই লড়াই করে টিকে আছে যশোরের কৃষি শ্রমিকের জীবন।

যশোরের কৃষি আজ যে সমৃদ্ধির উচ্চ শিখরে, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন এই কৃষি শ্রমিকরাই। ১ মে বা মে দিবস কেবল শহরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরের আলোচনা বা রাজপথের শ্লোগানে সীমাবদ্ধ না থেকে যদি ভূমিহীন ও প্রান্তিক চাষীর ন্যায্য মজুরি ও আইনি স্বীকৃতির অঙ্গীকার নিয়ে আসত, তবেই এই দিবসের প্রকৃত সার্থকতা জুটত। অন্নদাতার শ্রমকে স্বীকৃতি না দিয়ে যে উন্নয়ন, তা কখনো টেকসই হতে পারে না। সময় এসেছে কৃষি শ্রমিকদের ডাটাবেজ তৈরি করে তাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান এবং তাদের জীবনমান উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করার।

 

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)