ধ্রুব ডেস্ক
রাতের নিস্তব্ধতা চিরে ভেসে আসছিল অচেনা নুপুরের ঝংকার। এরপরই শুরু হলো কয়েকজন আবাসিক শিক্ষার্থীর অস্বাভাবিক আচরণ—কখনো উদভ্রান্তের মতো অনিয়ন্ত্রিত হাসি, আবার পরক্ষণেই বুকফাটা কান্না। আর এই রহস্যময় ঘটনার পরই ছড়িয়ে পড়লো তীব্র 'প্রেতাত্মার আছর' ও 'ভুতুড়ে বাড়ি'র গুঞ্জন। অশরীরী আতঙ্কের এমন চরম প্রভাবে এক রাতের ব্যবধানেই হোস্টেল ছেড়ে শত শত মাইল দূরে নিজের বাড়িতে পালিয়ে গেছে অন্তত ৬০০ শিক্ষার্থী।
চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি ঘটেছে ভারতের মহারাষ্ট্রের অমরাবতী জেলার পাহাড়ি আদিবাসী অধ্যুষিত মেলঘাট অঞ্চলের ডোমা গ্রামের একটি সরকারি ট্রাইবাল আশ্রম স্কুলে।
আবাসিক স্কুলটিতে প্রায় ৮১০ জন ছেলে-মেয়ে থেকে পড়াশোনা করে। তবে গত ২২ জুলাইয়ের পর থেকে সেই পরিচিত চত্বরে ভর করে এক অলৌকিক মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্ক। ঘটনার সূত্রপাত সেদিন রাতে, যখন চারজন ছাত্রী আচমকা অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করে। তাদের দেখাদেখি আরও কয়েকজন দাবি করে—নিঝুম রাতে হোস্টেলের বারান্দায় ও কক্ষে তারা স্পষ্ট নূপুরের আওয়াজ এবং অদ্ভুত সব শব্দ শুনতে পেয়েছে।
মুহূর্তের মধ্যেই সেই খবর জঙ্গলঘেরা গ্রামটিতে ছড়িয়ে পড়লে তৈরি হয় নানা মুখরোচক কুসংস্কার ও অলৌকিক গল্প। স্থানীয়দের কেউ দাবি করেন, সম্প্রতি স্কুল চত্বরের একটি প্রাচীন মহুয়া গাছ কাটার কারণেই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে অপদেবতা। কেউ আবার পার্শ্ববর্তী মন্দিরের দেবতার অভিশাপ বলে আখ্যা দেন, তো অন্য দল দাবি করে বসে—কয়েক দিন আগে অকালে মারা যাওয়া এক স্থানীয় আদিবাসী যুবকের আত্মাই ভর করেছে মেয়েদের শরীরে! অশরীরীর এমন কাল্পনিক ভয় ছড়িয়ে পড়তেই পরদিন সকাল থেকে ব্যাগপত্র গুটিয়ে হোস্টেল খালি করে রওয়ানা দেয় ভীতিসন্ত্রস্ত শিক্ষার্থীরা।
তবে এই কাল্পনিক ‘ভূতের আতঙ্ক’ ও কুসংস্কারের ডালপালা ছড়ানোর পর মাঠ পর্যায়ে তদন্তে নামে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একটি বিশেষ দল। আক্রান্ত ছাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক পরীক্ষা শেষে চিকিৎসকেরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন—এর পেছনে কোনো অতিপ্রাকৃত বা অলৌকিক কারণ নেই। মূলত দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, একা থাকার ভয় এবং একের দেখাদেখি অন্যের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ানোর মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া বা 'মাস হিস্টেরিয়া'র (Mass Hysteria) কারণেই এমন অস্বাভাবিক আচরণের সৃষ্টি হয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠে নামে কুসংস্কারবিরোধী সামাজিক সংগঠন ‘মহারাষ্ট্র অন্ধশ্রদ্ধা নির্মূলন সমিতি’র বিশেষজ্ঞরা। তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা বুঝিয়ে কাউন্সেলিং শুরু করেন। একই সঙ্গে স্থানীয় সংসদ সদস্য বলবন্ত ওয়াংখাড়ে ও স্কুলের প্রধান শিক্ষক সঞ্জয় চৌধুরী শিক্ষার্থীদের গুজবে কান না দিয়ে নির্ভয়ে ক্লাসে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন।
বিজ্ঞানভিত্তিক টানা কাউন্সেলিং এবং প্রশাসনের জোরালো পদক্ষেপে ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করেছে ভয়। কুসংস্কারের অন্ধকার পেরিয়ে ইতিমধ্যেই অনেক শিক্ষার্থী আবারও হোস্টেলের নিজেদের কক্ষে ফিরতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছে স্কুল কর্তৃপক্ষ।