ধ্রুব ডেস্ক
ফাইল ছবি ছবি: সংগৃহীত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংস নির্বাচনে উত্তরের ৩ জেলা ঠাকুরগাঁও, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের সংসদীয় আসনের ১৪টিতে জাতীয় পার্টির প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে বলে জানাগেছে। একটানা ২৫ বছর ধরে আসন ধরে রাখা প্রার্থীও পারেননি জামানত বাঁচাতে। তাদের মধ্যে ৫ বারের নির্বাচিত সংসদ সদস্যও রয়েছে। অনেক কেন্দ্রে জাতীয় পার্টির কোনো ভোটই পড়েনি, যা জনমনে বিস্ময় ও প্রশ্ন তৈরি করেছে। ‘লাঙ্গলের দুর্গ লালমনির হাটের ৩টি আসনে জাতীয় পার্টির ৩ প্রার্থী মিলে ৮ হাজার ভোট পেয়েছেন। একজনতো ভোটের বাক্সে তার পক্ষে হাজারখানেক ভোটও টানতে পারেননি।
লালমনিরহাটের ৩টি সংসদীয় আসনেই জাতীয় পার্টির ভরাডুবি দলটির অস্তিত্ব ভয়াবহ সংকটের বার্তা দিচ্ছে বলে রাজনৈতিক সচেনরা মনে করেন। এক সময়ের ‘লাঙ্গলের দুর্গ’ হিসেবে পরিচিত এই জেলায় জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও চেয়ারম্যানের উপদেষ্টাসহ ৩জনই জামানত হারিয়েছেন। লালমনিরহাট-৩ আসনে জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের উপদেষ্টা জাহিদ হাসান লিমন গত নির্বাচনে লক্ষাধিক ভোট পেয়েছিলেন, সেখানে এবার পেয়েছেন মাত্র দুই হাজার ১৫০ ভোট। লালমনিরহাট-২ আসনে এলাহান উদ্দিন পেয়েছেন মাত্র ৮১০ ভোট এবং লালমনিরহাট-১ আসনে সাবেক মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা মাত্র ৫ হাজার ১৫৮ ভোট পেয়ে জামানত হারিয়েছেন। জেলার তিনটি আসনে জাপা প্রার্থীদের প্রাপ্ত মোট ভোট মাত্র ৮ হাজার ১১১। এটি ওই দলটির বিপর্যয়ের গভীরতা স্পষ্ট করে দেয়।
ঠাকুরগাঁও-৩ (পীরগঞ্জ-রাণীশংকৈল) আসনে সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়েছেন জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও পাঁচবারের সাবেক সংসদ সদস্য হাফিজউদ্দীন আহম্মেদ। বিভিন্ন নির্বাচনে পাঁচবার বিজয়ী হওয়া এই নেতার এবার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। হাফিজউদ্দীন ছাড়াও গণঅধিকার পরিষদ, ইসলামী আন্দোলন ও স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ আরও সাত প্রার্থী এই আসন থেকে তাদের জামানত হারিয়েছেন।
কুড়িগ্রাম-৩ (উলিপুর) আসনের পরিস্থিতিও ছিল ঠাকুরগাঁওয়ের মতোই নজিরবিহীন। গত ২৫ বছর ধরে জাতীয় পার্টির দখলে থাকা এই আসনটি এবার তাদের হাত থেকে পুরোপুরি মুক্ত হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাহবুবুল আলম সালেহীর বিজয়ের বিপরীতে জাতীয় পার্টির প্রার্থী আব্দুস সোবাহান পেয়েছেন মাত্র ২হাজার ৭৮ ভোট। স্থানীয়দের মতে, এবার নারী ভোটারদের একটি বড় অংশই প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে জামায়াতের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। এখানে জাতীয় পার্টিসহ ৪প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। এমন ঘটনা কুড়িগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাসে আগে কখনও ঘটেনি। স্রোতের বিপরীতে ভোট দেওয়ার এই প্রবণতা উলিপুরের ভোটারদের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য হিসেবে আবারও প্রমাণিত হয়েছে।
স্থানীয় মহলের মতে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ‘দোসর’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া এবং তাদের ছত্রছায়ায় নির্বাচনে জেতার অপচেষ্টাই জাতীয় পার্টির এই শোচনীয় পরিণতির মূল
কারণ। এক সময়ের প্রভাবশালী দলটির নেতারা এখন নিজ এলাকাতেই ‘কাগুজে বাঘে’ পরিণত হয়েছেন বলে খোদ দলের নেতাকর্মীরাই আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে জনগণ ভোট দিতে পারলে অনেক চিত্রই পাল্টে যায়। এতদিন নানা অপকৌশলে জনগণকে যা দেখানো হয়েছে তার সবটুকু সত্যি নয় জাতীয় পার্টির এবারের নির্বাচন চিত্র সেটিই প্রমাণ করে। ঠাকুরগাঁও, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের এই নির্বাচনী চিত্র এটাই বলে দিচ্ছে যে, ভোটাররা আর অন্ধ আনুগত্যে বিশ্বাসী নন। তারা পুরোনো আমলের রাজনৈতিক অপকৌশল বর্জন করে নতুন ও কার্যকর নেতৃত্বের দিকে ঝুঁকছেন। জামানত হারানোর এই হিড়িক আগামী দিনের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের পথ প্রশস্ত করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।