ক্রীড়া ডেস্ক
দলের হিসাবে ভিতিনিয়া জয়ী হলেও কিমিখের সাথে তার দূরত্ব অল্পই ছবি: এ এফ পি
মিউনিখের মাঠে বায়ার্ন মিউনিখকে ১-১ গোলে ড্র-তে রুখে দিয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেছে পিএসজি। লড়াই শেষ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এই সেমিফাইনালের প্রথম লেগটি ফুটবল ইতিহাসে অন্যতম সেরা ম্যাচ হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
আধুনিক ফুটবলের প্রকৃত রূপ ফুটে উঠেছিল সেই প্রথম লেগেই। দুই দলের আক্রমণাত্মক মেজাজ, ডানা ব্যবহার করে ফুল-ব্যাকদের ওপরে উঠে আসা, আর চাপের মুখেও মাঝমাঠ থেকে আক্রমণ শানানোর সাহস—সব মিলিয়ে এক শ্বাসরুদ্ধকর প্রদর্শনী। কেউ কেউ এই ম্যাচকে কেবল গোল আর সুযোগের বিশৃঙ্খলা হিসেবে দেখলেও, বোদ্ধাদের চোখে এটি ছিল সুশৃঙ্খল আগ্রাসনের লড়াই। আর এই লড়াইয়ের নেপথ্য কারিগর ছিলেন এমন দুইজন খেলোয়াড়, যারা আড়ালে থেকে পুরো ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিয়েছেন।
গত ব্যালন ডি’অর তালিকার শীর্ষ থাকা একজন ছন্দ নিয়ন্ত্রক এবং অন্যজন এক দশক ধরে বিশ্ব ফুটবলের মানদণ্ড হয়ে থাকা অভিজ্ঞ এক সেনাপতি: ভিতিনিয়া এবং জশুয়া কিমিখ।
জশুয়া কিমিখ: বায়ার্নের স্পন্দিত হৃৎপিণ্ড
এক সময় কিমিখের সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। ভাবা হয়েছিল তিনি হয়তো মাঝমাঠের রক্ষণের মূল দায়িত্বে (নম্বর সিক্স) মানানসই নন। কিন্তু নতুন কৌশলে আর আস্থার প্রতিদানে তিনি আবারও ফিরে এসেছেন নিজের চেনা আঙিনায়। আধুনিক ফুটবলে একজন রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডার ঠিক কেমন হওয়া উচিত, কিমিখ তার জীবন্ত উদাহরণ।
তার বিশেষত্ব হলো খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা। তিনি কেবল বল পাস করেন না, বরং সঠিক সিদ্ধান্ত নেন। কখন খেলা ধীর করতে হবে আর কখন প্রতিপক্ষের রক্ষণ চিরে আক্রমণ চালাতে হবে, তা তিনি খুব ভালো বোঝেন। পরিসংখ্যানেও এর প্রতিফলন স্পষ্ট। চলতি চ্যাম্পিয়ন্স লিগে আক্রমণাত্মক সুযোগ তৈরির সূচকে তিনি সেরা ১ শতাংশ খেলোয়াড়ের মধ্যে রয়েছেন।
তার খেলার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো চাপের মুখে বল এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। তিনি কেবল বল ধরে রাখেন না, বরং বলকে বিপজ্জনক অবস্থানে পৌঁছে দেন। কিমিখ বিপদের জন্য অপেক্ষা করেন না, তিনি নিজেই প্রতিপক্ষের জন্য বিপদ তৈরি করেন।
ভিতিনিয়া: পিএসজির বল নিয়ন্ত্রক
ভিতিনিয়াকে অনেক চড়াই-উতরাই পার করতে হয়েছে। কখনও শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, কখনও বা তার কৌশলগত দক্ষতা অবমূল্যায়িত হয়েছে। কিন্তু লুইস এনরিকের অধীনে তিনি নিজেকে ইউরোপের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার হিসেবে প্রমাণ করেছেন। পর্তুগালের মাঝমাঠে ব্রুনো ফার্নান্দেজ বা বের্নার্দো সিলভার মতো তারকা থাকলেও, ভিতিনিয়াই যেন সব সুতোকে এক সুঁইয়ে গেঁথে রাখেন।
কিমিখের মতো তিনিও পরিসংখ্যানের বিচারে সেরা তালিকায় থাকলেও তার ধরণটা একটু ভিন্ন। কিমিখ যেখানে মুহূর্তেই খেলা দ্রুত করে ফেলেন, ভিতিনিয়া সেখানে ধারাবাহিকভাবে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখেন। তিনি বল পায়ে এগিয়ে যান, নিজেকে সবসময় সতীর্থদের পাসের জন্য উন্মুক্ত রাখেন এবং ধাপে ধাপে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। ভিতিনিয়া জোর করে আক্রমণ তৈরি করেন না; তিনি পরিকল্পিতভাবে আক্রমণ গড়ে তোলেন।
দুইজনই বিশ্বমানের মিডফিল্ডার, দুইজনের প্রভাবই অপরিসীম। কিন্তু তাদের খেলার ধরন সম্পূর্ণ আলাদা। একজনের খেলায় আছে বিদ্যুৎগতিতে আক্রমণ শুরুর প্রবণতা, অন্যজন ধৈর্যের সাথে খেলা গড়ে তোলায় বিশ্বাসী। এই দুই মায়েস্ত্রোর অবদানেই চ্যাম্পিয়ন্স লিগের এই দ্বৈরথ ফুটবল প্রেমীদের কাছে এক ধ্রুপদী লড়াই হিসেবে টিকে থাকবে।