বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক
ছবি: রয়টার্স
চাঁদের বুকে এক বিশাল ও বিরল আঘাতজনিত গর্তের (ক্র্যাটার) সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা, যার আকার বিখ্যাত রোমান কলোসিয়ামের চেয়েও বড়। প্রায় দুই বছর আগে একটি শক্তিশালী মহাজাগতিক বস্তুর আঘাতে এটি তৈরি হলেও এতদিন তা অলক্ষ্যেই ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে সৌরজগতে তৈরি হওয়া আঘাতজনিত গহ্বরগুলোর মধ্যে এটিই এখন পর্যন্ত শনাক্ত হওয়া সর্ববৃহৎ। বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’-এ প্রকাশিত দুটি পৃথক গবেষণাপত্রে এই চাঞ্চল্যকর আবিষ্কারের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার ‘লুনার রিকনেসেন্স অরবিটার’ (এলআরও) ২০২৪ সালের মে মাসে চাঁদের পৃথিবীমুখী অংশে এই গহ্বরটি প্রথম শনাক্ত করে। এর ব্যাস প্রায় ৭২৮ ফুট (২২২২ মিটার) এবং সর্বোচ্চ গভীরতা ১৪১ ফুট (৪৩ মিটার)। অত্যন্ত খাড়া দেয়ালবেষ্টিত এই গহ্বরটি তৈরি হওয়ার সময় চাঁদের প্রায় ১০০ কিলোমিটার এলাকার মাটি ও পাথরের স্তর ওলটপালট হয়ে যায়। মহাকাশযানটির মাধ্যমে প্রাপ্ত বিস্তারিত ছবি বিশ্লেষণের পর চলতি বছরের শুরুতে বিজ্ঞানীরা আনুষ্ঠানিকভাবে আবিষ্কারটি নিশ্চিত করেন। হিউস্টনের লুনার অ্যান্ড প্ল্যানেটারি ইনস্টিটিউটের প্রয়াত সাবেক পরিচালক টমাস ম্যাকগেচিনের সম্মানে গহ্বরটির নামকরণ করা হয়েছে। এটি এলআরও-এর এক দশক আগে আবিষ্কৃত আগের রেকর্ডধারী গর্তের চেয়ে প্রায় তিন গুণ বড়।
গবেষকদের মতে, এ ধরনের বড় আকারের মহাজাগতিক আঘাতের ঘটনা গড়ে প্রতি ১৩২ বছরে মাত্র একবার ঘটে। সংঘর্ষের সময় চাঁদের ধুলো ও পাথর ধারণার চেয়েও অনেক বেশি খাড়া কোণে চারদিকে ছিটকে পড়েছিল। এছাড়া গহ্বরটির চারপাশে প্রায় ৭ কিলোমিটার চওড়া একটি অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা অঞ্চল শনাক্ত করা গেছে। বিজ্ঞানীদের মতে, মহাজাগতিক বস্তুর আঘাতে চাঁদের উপরিভাগের আলগা মাটি বা ‘রেগোলিথ’ ব্যাপকভাবে স্থানচ্যুত হওয়ায় এই শীতল বলয় তৈরি হয়েছে।
এই আবিষ্কারটি চাঁদের পৃষ্ঠের পরিবর্তন সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের পুরনো ধারণাকে বদলে দিচ্ছে। ২০০৯ সাল থেকে এলআরও-এর সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখেছেন, গ্রহাণু বা ধূমকেতুর আঘাতে ছিটকে পড়া পদার্থের কারণে চাঁদের উপরিভাগের প্রায় ১ ইঞ্চি গভীর মাটি প্রতি ৮০ হাজার বছরে অন্তত একবার উল্টে যায়। এর অর্থ হলো, চাঁদের পৃষ্ঠ বিজ্ঞানীরা আগে যেমনটি ভাবতেন, তার চেয়েও অনেক দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে অ্যাপোলো মিশনের নভোচারীদের রেখে যাওয়া ঐতিহাসিক পায়ের ছাপগুলো চাঁদের মাটিতে চিরকাল টিকে থাকবে না; সময়ের বিবর্তনে তা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
ভবিষ্যতে চাঁদে নাসার পরিকল্পিত মানবসেটেলমেন্ট বা ঘাঁটি তৈরির ক্ষেত্রে এই গবেষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই জাতীয় আঘাতের সময় ছিটকে আসা মাটি ও পাথরের টুকরো ভবিষ্যৎ চন্দ্রঘাঁটির জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, তা এখন নির্ধারণ করছেন প্রকৌশলীরা। এই উপাত্ত কাজে লাগিয়ে চন্দ্রঘাঁটির পরিকাঠামো আরো সুরক্ষিত ও মজবুতভাবে নকশা করা সম্ভব হবে, যা ভবিষ্যতে নভোচারীদের জীবন ও মহাকাশযানকে নিরাপদ রাখবে।