বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক
ছবি: এ আই প্রণীত
শিশুর পড়ার দক্ষতা নির্ভর করে শুধু মেধা বা চোখের দেখার ক্ষমতার ওপর—এতদিনের এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে নতুন এক গবেষণা। গবেষকেরা বলছেন, বরং শব্দের ধ্বনি বোঝা, ভাষা ও জ্ঞান কাজে লাগানোর ক্ষমতাই পড়তে শেখার ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘদিন ধরেই ধারণা করা হতো, যে শিশুরা ভালো পড়ে তারা হয়তো তুলনামূলক বেশি বুদ্ধিমান। আর পড়তে গিয়ে যারা সমস্যায় পড়ে, তাদের সক্ষমতাও কম—এমন ধারণাও কম ছিল না।
কেউ কেউ আবার মনে করতেন, বইয়ের পাতায় থাকা অক্ষর ও শব্দ চোখ কীভাবে দেখে এবং মস্তিষ্কে প্রক্রিয়াজাত করে, পড়ার সমস্যার পেছনে সেটিই বড় কারণ।
তবে নতুন গবেষণা বলছে, বাস্তব চিত্র অনেকটাই ভিন্ন।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস এ অ্যান্ড এম ইউনিভার্সিটির শিক্ষা মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড্যানিয়েল হাজভস্কির নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় শিশুদের পড়ার দক্ষতার সঙ্গে বিভিন্ন মানসিক সক্ষমতার সম্পর্ক খতিয়ে দেখা হয়েছে।
গবেষণায় ইউনিভার্সিটি অব কানসাস, সেন্ট জন’স ইউনিভার্সিটি, মন্টক্লেয়ার স্টেট ইউনিভার্সিটি এবং টেম্পল ইউনিভার্সিটির গবেষকেরাও অংশ নেন।
গবেষকেরা ১৩৭টি জ্ঞানীয় ও একাডেমিক পরীক্ষার সমন্বিত তথ্যভান্ডার থেকে প্রায় ৫০ হাজার পারস্পরিক সম্পর্কের তথ্য বিশ্লেষণ করেন। এত বড় পরিসরের তথ্য একত্র করে তারা বোঝার চেষ্টা করেন, কোন মানসিক সক্ষমতা একটি শিশুর পড়ার দক্ষতাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে বিশ্লেষণে দেখা যায়, দৃশ্যগত তথ্য প্রক্রিয়াজাত করার ক্ষমতার সঙ্গে পড়ার দক্ষতার উল্লেখযোগ্য কোনো সম্পর্ক নেই। অর্থাৎ একটি শিশু চোখ দিয়ে অক্ষর বা শব্দ কতটা ভালোভাবে দেখতে ও প্রক্রিয়াজাত করতে পারে, সেটিই তার পড়ার দক্ষতা নির্ধারণ করে—এমন ধারণার পক্ষে গবেষণায় শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
গবেষণায় সাধারণ বুদ্ধিমত্তার ভূমিকা অবশ্যই পাওয়া গেছে। তবে এর প্রভাব আগের অনেক গবেষণায় ধারণা করা হয়েছিল তার চেয়ে কম।
এর পরিবর্তে দুটি বিষয় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে—শব্দের ধ্বনি শনাক্ত করার ক্ষমতা এবং ভাষা ও বিষয়বস্তু বোঝার জ্ঞান। শব্দের ধ্বনি শনাক্ত করার ক্ষমতা বলতে কোনো শব্দের ভেতরে থাকা আলাদা আলাদা ধ্বনি শুনে চেনা ও আলাদা করতে পারাকে বোঝায়।
যেমন, একটি শিশু কোনো শব্দ শুনে সেটি কোন কোন ধ্বনি দিয়ে তৈরি হয়েছে, তা যত ভালোভাবে বুঝতে পারে, নতুন শব্দ পড়া শেখার ক্ষেত্রেও তার সুবিধা তত বেশি হতে পারে। অন্যদিকে ভাষা ও বিষয়বস্তু বোঝার জ্ঞানের মধ্যে রয়েছে শিশুর শব্দভান্ডার, আগে থেকে অর্জিত জ্ঞান এবং চারপাশের পৃথিবী সম্পর্কে তার ধারণা। গবেষণায় দেখা গেছে, এই দুই ধরনের সক্ষমতা সাধারণ বুদ্ধিমত্তার বাইরেও পড়ার দক্ষতার সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক রাখে। বিশেষ করে নতুন শব্দ পড়া এবং পড়া বিষয়বস্তুর অর্থ বোঝার ক্ষেত্রে এগুলোর ভূমিকা সবচেয়ে স্পষ্ট।
শুধু শ্রবণ ও বোঝার ক্ষমতাই নয়, শিশুর স্মৃতিশক্তি, যুক্তি প্রয়োগের সক্ষমতা এবং দ্রুত তথ্য প্রক্রিয়াজাত করার ক্ষমতাও পড়ার দক্ষতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর অর্থ হলো, একটি শিশু ভালো পাঠক হয়ে ওঠার পেছনে কোনো একটি মাত্র মানসিক ক্ষমতা কাজ করে না। বরং মস্তিষ্কের বিভিন্ন ধরনের দক্ষতা একসঙ্গে কাজ করে ধীরে ধীরে পড়ার সক্ষমতা তৈরি করে।
পড়তে সমস্যা মানেই শিশু কম মেধাবী নয়
গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো—কোনো শিশু পড়তে পারছে না মানেই সে কম মেধাবী বা কম সক্ষম, এমনটা ভাবার কারণ নেই। বরং শিশুটি ঠিক কোন জায়গায় সমস্যায় পড়ছে, সেটি শনাক্ত করে সেই নির্দিষ্ট দক্ষতা উন্নত করার দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। কারণ একেক শিশুর পড়ার সমস্যার কারণ একেক রকম হতে পারে। কারও শব্দের ধ্বনি শনাক্ত করতে সমস্যা হতে পারে। আবার কারও শব্দভান্ডার বা বিষয়বস্তু বোঝার জ্ঞান তুলনামূলক দুর্বল হতে পারে। তাই সব শিশুর জন্য একই ধরনের পদ্ধতি প্রয়োগ না করে সমস্যার ধরন অনুযায়ী সহায়তা দেওয়াই বেশি কার্যকর হতে পারে।
বাড়িতেও তৈরি করা যায় পড়ার শক্ত ভিত
অভিভাবকদের জন্যও এই গবেষণায় রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। গবেষক ড্যানিয়েল হাজভস্কির মতে, বাড়িতে শিশুর মৌলিক দক্ষতাগুলো শক্তিশালী করার ছোট ছোট উদ্যোগও পরবর্তী সময়ে উন্নত পড়ার সক্ষমতা তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। শিশুর সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা, নতুন শব্দ শেখানো, গল্প পড়া এবং পড়া বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করার মতো সাধারণ অভ্যাস তার ভাষা ও বোঝার ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।
হাজভস্কির মতে, পড়তে গিয়ে শিশুর সমস্যাকে তার সক্ষমতার ঘাটতি হিসেবে দেখার পরিবর্তে কোন নির্দিষ্ট দক্ষতাটি আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন, সেটি খুঁজে বের করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
স্কুল-পরিবারের সম্মিলিত সহায়তাই গুরুত্বপূর্ণ
গবেষকদের মতে, পড়া শেখা কোনো একদিনের বিষয় নয়। এটি সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া। এ কারণে শুধু বিদ্যালয়ের শিক্ষক বা শ্রেণিকক্ষের ওপর নির্ভর না করে পরিবার ও সমাজকেও শিশুর পড়ার বিকাশে ভূমিকা রাখতে হবে।
সবশেষে গবেষণাটি যে বার্তাটি সামনে আনছে তা হলো—ভালো পাঠক হওয়ার জন্য শুধু বেশি বুদ্ধিমান হওয়াই যথেষ্ট নয়। শব্দের ধ্বনি বোঝা, ভাষা ও জ্ঞান কাজে লাগানো, স্মৃতি ও যুক্তির দক্ষতা বাড়ানো—সবকিছুর সম্মিলিত বিকাশই একটি শিশুর পড়ার দক্ষতার শক্ত ভিত তৈরি করে।