বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
১.৪ টেরাবাইট—সংখ্যাটি শুনলে বিশাল কোনো মুভি আর্কাইভের কথা মনে হতে পারে। তবে বাস্তবে এটি কোনো ভিডিও ফাইল নয়, বরং একটি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই মডেলের সাইজ! বেইজিং-ভিত্তিক স্টার্টআপ মুনশট এআই তাদের অত্যাধুনিক মডেল ‘কিমি কে৩’-এর সম্পূর্ণ ওয়েট সম্প্রতি হাগিং ফেস প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করেছে। আর এর মধ্য দিয়ে এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ওপেন-ওয়েট এআই মডেলের খেতাব জিতে নিয়েছে।
মাইক্রোসফট কোপাইলটে এর সাম্প্রতিক টেস্টিং এবং প্রযুক্তি মোগল ইলন মাস্কের প্রশংসার পর থেকেই মডেলটি নিয়ে প্রযুক্তি বিশ্বে ব্যাপক উন্মাদনা চলছিল। সেই আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেই, পূর্বনির্ধারিত ২৭ জুলাইয়ের আগেই মুনশট তাদের এই মডেল ওয়েট, টেকনিক্যাল রিপোর্ট ও ইনফ্রাস্ট্রাকচার স্ট্যাক পুরোপুরি ওপেন সোর্স করে দিয়েছে।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে ‘কিমি কে৩’ রীতিমতো বিস্ময়কর। মোট ২.৮ ট্রিলিয়ন প্যারামিটারের এই মডেলে ‘মিক্সচার-অফ-এক্সপার্টস’ (MoE) আর্কিটেকচার ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে প্রতি টোকেন প্রসেসিংয়ে ৮৯৬টি এক্সপার্টের মধ্যে মাত্র ১৬টি (১০৪ বিলিয়ন প্যারামিটার) সক্রিয় থাকে, যা একে অত্যন্ত দ্রুতগতিসম্পন্ন করে তোলে। এর ১০ লক্ষ টোকেনের বিশাল কনটেক্সট উইন্ডো এবং নেটিভ ভিশন সক্ষমতা একইসাথে ছবি ও ভিডিও নিখুঁতভাবে প্রসেস করতে পারে। এছাড়া, নতুন ‘কিমি ডেল্টা অ্যাটেনশন’ (KDA) এবং ‘অ্যাটেনশন রেসিডুয়ালস’ প্রযুক্তির কল্যাণে এটি পূর্বসূরি কিমি কে২-এর তুলনায় আড়াই গুণ বেশি বুদ্ধিমত্তা প্রদর্শন করতে সক্ষম। এপিআই খরচের দিক থেকেও মডেলটির একটি স্পষ্ট রূপরেখা দেওয়া হয়েছে; ক্যাশ-হিট ইনপুটে প্রতি মিলিয়ন টোকেনের মূল্য ০.৩০ ডলার, ক্যাশ-মিসে ৩ ডলার এবং আউটপুটে ১৫ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে।
মডেলটির আসল সক্ষমতা বোঝাতে মুনশট বেশ কয়েকটি চমকপ্রদ কেস স্টাডিও সামনে এনেছে। মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে মডেলটি নিজেই ৪ বর্গ মিলিমিটারের একটি চিপের সম্পূর্ণ ডিজাইন, অপ্টিমাইজেশন ও ভেরিফিকেশনের কাজ শেষ করেছে, যা সিমুলেশনে সেকেন্ডে ৮,৭০০-এর বেশি টোকেন প্রসেস করতে সক্ষম। এছাড়াও এটি শূন্য থেকে ‘মিনিট্রাইটন’ (MiniTriton) নামের একটি জিপিইউ কম্পাইলার তৈরি করেছে, যা পারফরম্যান্সে অনেক ক্ষেত্রে বর্তমান ইন্ডাস্ট্রির শীর্ষস্থানীয় ট্রাইটনকেও পেছনে ফেলেছে। জটিল গবেষণার ক্ষেত্রেও এর গতি অবিশ্বাস্য; যে অ্যাস্ট্রোফিজিক্স বা জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানের কাজ শেষ করতে একজন অভিজ্ঞ গবেষকের এক থেকে দুই সপ্তাহ সময় লাগত, কিমি কে৩ মাত্র দুই ঘণ্টায় ২০টির বেশি গবেষণাপত্র ও ৩০০টির বেশি সমীকরণ বিশ্লেষণ করে তা সম্পন্ন করেছে।
ওপেন-ওয়েট হওয়ার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, কোনো এপিআই সাবস্ক্রিপশন ছাড়াই যেকোনো ডেভেলপার বা প্রতিষ্ঠান নিজস্ব সার্ভারে এটি চালাতে পারবেন। তবে বাস্তবতা হলো, ২.৮ ট্রিলিয়ন প্যারামিটারের এই বিশাল মডেলটি রান করার জন্য কমপক্ষে ৬৪টি বা তার বেশি অ্যাক্সিলারেটর সমৃদ্ধ সুপারনোড কনফিগারেশন প্রয়োজন। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের সাধারণ প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এত বিশাল কম্পিউটিং শক্তির জোগান দেওয়া কার্যত অসম্ভব একটি বিষয়।
মুনশট এআই তাদের এই অর্জন নিয়ে উচ্ছ্বসিত হলেও, নিজেদের সীমাবদ্ধতার কথাও অকপটে স্বীকার করেছে। টেকনিক্যাল রিপোর্টে তারা জানিয়েছে, বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতায় থাকা ‘ক্লড ফেবল ৫’ এবং ‘জিপিটি-৫.৬ সোল’-এর তুলনায় কিমি কে৩-এর ইউজার এক্সপেরিয়েন্সে এখনও লক্ষণীয় ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি, জটিল কাজ সমাধানের সময় মডেলটি অনেক ক্ষেত্রে অতিমাত্রায় ‘প্রোঅ্যাক্টিভ’ বা অতি-উৎসাহী হয়ে ব্যবহারকারীর হয়ে অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে পারে বলেও সতর্ক করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
সব মিলিয়ে, সীমাবদ্ধতা থাকলেও কিমি কে৩-এর এই উন্মুক্তকরণ ওপেন-সোর্স এআইয়ের দুনিয়ায় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।