ধ্রুব ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
পারিবারিক সচ্ছলতার আশায় চড়া সুদে ঋণ ও ধারদেনা করে প্রায় ১০ লাখ টাকা খরচ করেছিলেন জামালপুরের যুবক আরমান আলী (৩০)। কিন্তু ভালো চাকরির পরিবর্তে দালালের প্রতারণায় আজ তিনি জীবন-মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখভাগে রুশ সেনাবাহিনীর হয়ে লড়তে বাধ্য হওয়া এই বাংলাদেশি যুবকের এখন একটাই আকুতি, ‘এই জীবন তো চাই নাই, ডাল-ভাত খেয়ে বাঁচতে চাই।’
জামালপুর সদর উপজেলার শরিফপুর ইউনিয়নের গোদাশিমলা এলাকার রফিকুল ইসলামের ছেলে আরমান আলী। সংসারে অভাব দূর করতে গত ৭ মে একটি এজেন্সির মাধ্যমে রাশিয়ায় পাড়ি জমান তিনি। কথা ছিল কোনো কোম্পানি বা নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ পাবেন। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর দালাল চক্র তাঁকে রুশ সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করে দেয়। বর্তমানে তিনি ইউক্রেন সীমান্তের যুদ্ধশিবিরে বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। ইতিমধ্যে ড্রোন হামলায় তিনি আহতও হয়েছেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, আরমানের বাড়িতে এখন শুধুই উৎকণ্ঠা আর অজানা আতঙ্ক। তাঁর পাঁচ মাস বয়সী শিশুসন্তান ও স্ত্রী রয়েছে বাড়িতে, যঁদের কাছে আরমানের অক্ষত অবস্থায় দেশে ফেরা এখন চরম অনিশ্চিত। ছেলের খোঁজে অনবরত কাঁদছেন মা রেখা বেগম। অভাব ঘোচাতে ছেলে বিদেশে গিয়ে যে বিপদে পড়বে, তা কল্পনাও করতে পারেনি পরিবারটি। এখন প্রতিটি মুহূর্ত তাঁরা ছেলের একটি ফোনকলের অপেক্ষায় পার করছেন।
স্বজনেরা জানান, রাশিয়ায় যাওয়ার পর বেশ কিছুদিন আরমানের কোনো খোঁজ ছিল না। গত ২৬ মে হঠাৎ ফোন করে আরমান জানান, তাঁকে সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে এবং তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে আছেন। এরপর থেকে তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরমানের একটি ভিডিও বার্তা দেখে স্বজনেরা কান্নায় ভেঙে পড়েন।
রুশ সেনাবাহিনীর পোশাক পরা ওই ভিডিওতে আরমানকে বলতে শোনা যায়, কোম্পানি বা কনস্ট্রাকশনে কাজ দেওয়ার নাম করে তাঁদের মোট ৩০ জনকে রাশিয়ায় নেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর দুদিনের মাথায় তাঁদের রাশিয়ার দুই নাগরিকের কাছে হস্তান্তর করা হয়, যারা মূলত তাঁদের যুদ্ধের জন্য বিক্রি করে দেয়। মাত্র তিন-চার দিনের নামমাত্র ট্রেনিং দিয়ে তাঁদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
ভিডিওতে আরমান আরও জানান, ফ্রন্টলাইনে তাঁদের ড্রোন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হয় এবং মাছের টোপের মতো ব্যবহার করা হয়। ড্রোনের নির্দেশ মতো ডানে-বামে সরতে হয়, যার নিচে মাইন আর ওপরে ড্রোন হামলা চলে। তাঁদের ১৬ জনের দলের মধ্যে ১২ জনই ইতিমধ্যে মারা গেছেন। বাকি চারজন ড্রোন হামলায় আহত হয়ে চিকিৎসাধীন বা ক্যাম্পে আছেন। আরমান নিজে বাম হাতে আঘাত পেয়েছেন। ভাষা না জানায় এবং ফ্রন্টলাইনে যেতে অস্বীকৃতি জানালে মারধর ও ভূগর্ভস্থ বাংকারে আটকে রাখা হয় বলে তিনি জানান।
আরমানের বাবা রফিকুল ইসলাম ও ছোট ভাই মো. সালমান জানান, এর আগে আরমান ইরাকে চার বছর কাজ করে তিন বছর আগে দেশে ফিরেছিলেন। দুই বছর আগে বিয়ে করার পর দীর্ঘদিন বেকার থাকায় সংসারের অভাব মেটাতে এই রাশিয়ার পথ বেছে নেন। ছেলেকে অক্ষত অবস্থায় দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের জরুরি ও কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করেছে অসহায় পরিবারটি।