ধ্রুব ডেস্ক
বাড়ির আঙিনায় বসে স্বজনদের নিজের ফিরে আসার গল্প বলছেন সৈয়দ আহম্মদ(লাঠি হাতে) ছবি: সংগৃহীত
বাড়ির আঙিনায় দাঁড়িয়ে এক জীর্ণকায় বৃদ্ধ। পরনে মলিন পোশাক, চোখেমুখে দীর্ঘ পথচলার ক্লান্তি। তিনি হিন্দি আর ভাঙা বাংলায় উপস্থিত জনতাকে বলছিলেন, এটিই আমার বাড়ি। এখানে আমার বাবা-মা ছিলেন, আমার স্ত্রী আর ছোট্ট সন্তান ছিল। তার কথা শুনে ভিড় জমে যায় উৎসুক প্রতিবেশীদের। কিন্তু তিনি যাদের নাম বলছিলেন, তাদের কেউই আর বেঁচে নেই। অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় আগে নিখোঁজ হওয়া এক মানুষ এভাবেই ফিরে এলেন নিজ ভূমে, যা দেখে সবার মনে একটাই প্রশ্ন—এটি কি বাস্তব নাকি রূপকথা?
নোয়াখালীর হাতিয়া পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের লক্ষ্মীবদিয়া গ্রামের ছৈয়দ আহম্মদ যখন ৫ মে নিজ বাড়িতে পা রাখেন, তখন যেন থমকে গিয়েছিল সময়। ৫৪ বছর আগে জাহাজে চাকরির উদ্দেশ্যে ঘর ছেড়েছিলেন তিনি। বাড়িতে তখন স্ত্রী আর মাত্র চার মাস বয়সী কোলের সন্তান। এখন তার বয়স ৮৩ বছর, আর তার সেই কোলের সন্তান নূর হোসেনের বয়স এখন ৫৫। জীবনের ৫৪টি বসন্ত পেরিয়ে এসে নূর হোসেন প্রথমবারের মতো তার বাবাকে সরাসরি দেখলেন।

যেভাবে নিখোঁজ হয়েছিলেন ছৈয়দ আহম্মদ
ঘটনাটি ১৯৭২ সালের। ছৈয়দ আহম্মদ চট্টগ্রামের একটি কার্গো জাহাজে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। তখন তিনি তেজোদীপ্ত এক যুবক। বাড়ির অভাব-অনটন দূর করতে পাড়ি জমিয়েছিলেন মাঝসমুদ্রে। কিন্তু একদিন বঙ্গোপসাগরে এক ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়ে তাদের জাহাজটি। কক্সবাজারের কুতুবদিয়া সংলগ্ন এলাকায় উত্তাল সাগরে তলিয়ে যায় বিশালাকার জাহাজটি। জাহাজের অন্যান্য সহকর্মীদের ভাগ্যে কী জুটেছিল তা আজ আর আহম্মদের মনে নেই। তিনি শুধু মনে করতে পারেন, দীর্ঘ সময় তিনি উত্তাল নোনা জলে ভেসে ছিলেন। যখন জ্ঞান ফেরে, তখন তিনি ভারতীয় নৌবাহিনীর হাতে।
দীর্ঘ ৫৪ বছর ভারতে যেভাবে কাটল
ভারতীয় নৌবাহিনী তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। সুস্থ হওয়ার পর তিনি ভারতের উত্তর প্রদেশের আগ্রার তাজমহল এলাকায় আশ্রয় নেন। সেখানে থাকতেই তিনি ভারতীয় নাগরিকত্ব ও পাসপোর্ট লাভ করেন বলে দাবি করেন। জীবনের দীর্ঘ সময় তিনি ভারতের বিভিন্ন স্থানে কাটিয়েছেন, যার একটি বড় অংশ অতিবাহিত হয়েছে আজমির শরিফে। দীর্ঘ প্রবাস জীবনে তাঁর মাতৃভাষা বাংলা প্রায় ফিকে হয়ে এসেছে। বর্তমানে তিনি বেশির ভাগ কথা বলেন হিন্দিতে, যার মাঝে মাঝে দু-একটি ভাঙা বাংলা শব্দ জুড়ে দেন।
যে স্বপ্নে ফিরল নাড়ির টান
এতগুলো বছর কেটে গেলেও মনের এক কোণে রয়ে গিয়েছিল ফেলে আসা পরিবারের স্মৃতি। ছৈয়দ আহম্মদ জানান, সম্প্রতি তিনি স্বপ্নে তাঁর সন্তানকে দেখতে পান। সেই স্বপ্নই তাঁর মনে সুপ্ত থাকা দেশপ্রেম আর নাড়ির টানকে জাগিয়ে তোলে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন যেভাবেই হোক জন্মভূমিতে ফিরবেন।
তবে ফেরার পথটি সহজ ছিল না। ফেরার পথে তার পাসপোর্টসহ মূল্যবান নথিপত্র চুরি হয়ে যায়। রিক্ত হাতে তিনি যশোর সীমান্তে এসে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) কাছে নিজের করুণ কাহিনী বর্ণনা করেন। তাঁর কথা শুনে বিএসএফ জওয়ানরা তাঁকে বাংলাদেশে প্রবেশের সুযোগ করে দেন।
বেনাপোল থেকে হাতিয়া
যশোর সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের পর তিনি বিজিবির (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) শরণাপন্ন হন। বিজিবি সদস্যরা মানবিক দিক বিবেচনা করে তাকে ট্রেনের টিকিট কেটে দিয়ে ঢাকার ট্রেনে তুলে দেন। ট্রেন থেকে কমলাপুর নেমে যাত্রীদের সহায়তায় তিনি রিকশাযোগে সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ডে যান। সেখান থেকে বাসে করে নোয়াখালীর সোনাপুর।
সোনাপুর থেকে সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে তিনি পৌঁছান হাতিয়ার চেয়ারম্যানঘাট। নদী পার হয়ে নলচিরা ঘাটে পৌঁছে যখন তিনি লক্ষ্মীবদিয়া গ্রামের নাম ধরে রিকশা খোঁজেন, তখন স্থানীয়দের কাছে তিনি ছিলেন স্রেফ একজন আগন্তুক। কিন্তু রিকশা থেকে নেমে যখন তিনি তার ভাই আবু বকর ও ছেলে নূর হোসেনের নাম বলতে শুরু করেন, তখন গ্রামের মানুষের বিস্ময়ের সীমা থাকে না।
স্বজনদের চিনে নেওয়া ও স্মৃতি রোমন্থন
ছৈয়দ আহম্মদের এক সৎভাই আবুল খায়ের তাকে চিনতে পারেন। খায়ের জানান, "ভাই যখন নিখোঁজ হন তখন আমার বয়স বড়জোর ১০ কি ১১। তার মুখটা অনেকটা ভুলেই গিয়েছিলাম। কিন্তু তার বলা অনেক কথা আমাদের পারিবারিক স্মৃতির সাথে হুবহু মিলে যাচ্ছে।" ভাইপোর কাছে শোনা পুরনো গল্পের সাথে আহম্মদের বিবরণের মিল পাওয়া যাওয়ায় নিশ্চিত হওয়া যায় যে, ইনিই সেই হারিয়ে যাওয়া আহম্মদ।
আনন্দ আর আক্ষেপের সংমিশ্রণ
৫ দশক পর বাবাকে ফিরে পেয়ে ছেলে নূর হোসেনের আনন্দের সীমা নেই। তিনি বলেন, "জন্মের পর কোনোদিন বাবাকে দেখিনি। মা তার জন্য অপেক্ষা করতে করতে মারা গেছেন। আজ যখন বাবা ফিরে এসেছেন, তখন মনে হচ্ছে এটি কোনো অলৌকিক ঘটনা।
তবে এই মিলনের আনন্দে কিছুটা বিষাদ ছড়িয়েছে পারিবারিক জটিলতা। নূর হোসেনের দাবি, তার চাচাতো ভাইয়েরা বাবাকে নিজেদের কাছে আটকে রেখেছেন, তাকে বাবার সেবা করার সুযোগ দিচ্ছেন না। এ নিয়ে তিনি হাতিয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেছেন। হাতিয়া থানার ওসি মো. কবির হোসেন জানান, "আমরা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত। এটি একটি পারিবারিক বিষয়। পরিবার চাইলে পুলিশ আইনগত সহায়তা দেবে।" সূত্র : প্রথম আলো