শেখ জালাল
মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের কালজয়ী চতুর্দশপদী কবিতা ‘বটবৃক্ষ’র স্মৃতি-বিজড়িত বটগাছ। ছবি: ধ্রুব নিউজ
“দেব-অবতার ভাবি বন্দে যে তোমারে,
নাহি চাহে মনঃ মোর তাহে নিন্দা কর্
তরুরাজ ! প্রত্যক্ষতঃ ভারত-সংসারে,
বিধির করুণা তুমি তরু-রূপ ধরি”.........
মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের কালজয়ী চতুর্দশপদী কবিতা ‘বটবৃক্ষ’র স্মৃতি অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। যশোরের কেশবপুরের সাগরদাঁড়িতে কপোতাক্ষ নদের তীরে অবস্থিত এই গাছটি দীর্ঘ ৩০০ বছর ধরে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। গত শনিবার দুপুরে প্রবল কালবৈশাখী ঝড়ের কবলে পড়ে উপড়ে গেছে কবির স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক সেই বিশাল বটগাছটি। কালের সাক্ষী মধুপল্লীর ৩০০ বছরের সেই বটবৃক্ষে’র স্মৃতি সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ঝড়ের তীব্রতায় মহাকবির বাড়ির পূর্ব পাশে কপোতাক্ষের পাড়ে অবস্থিত বটবৃক্ষটি শিকড়সহ উপড়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দা জ্যোস্না হালদার (৬২) জানান, ঝড়ের সময় তিনি নদীর ধারেই ছিলেন। তিনি বলেন, হঠাৎ দেখলাম গাছের শিকড়গুলো নেচে উঠল, আর মুহূর্তের মধ্যেই পুরো গাছটি নদীর ধারের জমির ওপর কাত হয়ে পড়ল। কবির স্মৃতি চলে গেল ।
বটগাছটি উপড়ে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন প্রিয় স্মৃতির শেষ অংশটুকু দেখতে।
ব্যাংকার সুদীপ সিংহ রায় তার পেশাগত কাজে কেশবপুর এসে খবরটি শুনেই ছুটে যান নদীর পাড়ে। তিনি বলেন, “মহাকবির অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত ‘বটবৃক্ষ’ কবিতাটি এই গাছটিকে ঘিরেই। এটি আমাদের বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য ঐতিহ্য। স্মৃতিটুকু সংরক্ষণ করার দাবি জানান তিনি।

স্থানীয় বাসিন্দা উজ্জ্বল দত্ত ও মুফতি তাহেরুজ্জামান জানান, মহাকবি তার শৈশব ও জন্মভূমির স্মৃতি নিয়ে যখন কাব্য রচনা শুরু করেন, তখন এই বটবৃক্ষটি ছিল তার অন্যতম অনুপ্রেরণা। এই গাছের তলায় বসেই তিনি তার বিখ্যাত সনেটগুলো নিয়ে ভাবতেন। স্থানীয়দের কাছে এটি কেবল একটি গাছ ছিল না, ছিল রোদ-বৃষ্টির আশ্রয় ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের জায়গা।
সাগরদাঁড়িতে অবস্থিত মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত স্মৃতি জাদুঘরের (মধুপল্লী) কাস্টোডিয়ান মো. হাসানুজ্জামান জানান, ১৮৬৫ সালে মহাকবি এই গাছটি নিয়ে বটবৃক্ষ কবিতাটি লিখেছিলেন। আনুমানিক ৩০০ বছরের পুরনো এই নিদর্শনের পতনের মাধ্যমে একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলো। বটগাছটি উপড়ে যাওয়ায় কষ্ঠ পেয়েছেন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। তারা জানান, প্রচলিত প্রত্নসম্পদ আইনের আওতায় গাছ অন্তর্ভুক্ত না থাকায় তারা সরাসরি এর রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারেননি। তবে স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় ওই স্থানে পুনরায় বৃক্ষরোপণ এবং স্থানটিকে পর্যটকদের জন্য আরও আকর্ষণীয় করে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
ধ্রুব/এস.আই