Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

❒ ইশতেহার: বিএনপি ও জামায়াত

দুই দর্শন দুই পথ

ধ্রুব ডেস্ক ধ্রুব ডেস্ক
প্রকাশ : শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারি,২০২৬, ০১:৩২ পিএম
দুই দর্শন দুই পথ

ছবি: প্রতীকী

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এখন ইশতেহারকেন্দ্রিক বিতর্কে উত্তপ্ত। কে কেমন রাষ্ট্র গড়তে চায়, কাদের হাতে ভবিষ্যৎ নিরাপদ, এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন ভোটাররা। এ প্রেক্ষাপটে দেশের অন্যতম প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং কল্যাণভিত্তিক ইসলামী আদর্শভিত্তিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণার মাধ্যমে দু’টি আলাদা রাষ্ট্রদর্শন সামনে এনেছে।

একটি দল বলছে, বিদ্যমান ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে কাঠামোগত সংস্কার; অন্য দল বলছে রাষ্ট্রসংস্কারে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিমুক্ত সমাজ গড়তে নৈতিক অবক্ষয় থেকে রাষ্ট্র সমাজকে রক্ষার জন্য মূল্যবোধের পুনর্গঠন জরুরি। ফলে সামনে এসেছে দু’টি আলাদা উন্নয়ন মডেল। একটি প্রশাসনিক-অর্থনৈতিক ধারাবাহিকতাযুক্ত সংস্কারকেন্দ্রিক, অন্যটি নৈতিক-সামাজিক ও কাঠামোগত রূপান্তরকেন্দ্রিক।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়; বরং রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ধারণের লড়াই।

বিএনপি : কল্যাণমুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশের রূপরেখা

বিএনপির ঘোষিত ইশতেহারে কেন্দ্রীয় প্রতিশ্রুতি হলো ‘কল্যাণমুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’ গঠন। দলটি দাবি করছে, গত এক দশকে নির্বাচনব্যবস্থা, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক খাতের ওপর মানুষের আস্থা কমেছে। তাই প্রথম কাজ হবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর করা।

দলটির মতে, উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো দিয়ে হয় না; উন্নয়ন টেকসই হয় যখন নাগরিকের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। এই দর্শনের ওপর দাঁড়িয়ে বিএনপি শাসন সংস্কার, দুর্নীতি দমন, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষাকে ইশতেহারের চারটি প্রধান স্তম্ভ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

জামায়াত : নৈতিকতা ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি

অন্য দিকে জামায়াতে ইসলামী তাদের রাজনৈতিক দর্শন দাঁড় করিয়েছে ইনসাফভিত্তিক সুশাসন ও কর্মসংস্থানকে মূল লক্ষ্য ধরে নৈতিকতা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে। দলটির বক্তব্য- রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি, বৈষম্য ও সহিংসতার মূল কারণ নৈতিক অবক্ষয়। তাই প্রশাসনিক সংস্কারের পাশাপাশি মানুষ ও সমাজের চরিত্র গঠনে জোর দিতে হবে।

তাদের লক্ষ্য একটি ‘ন্যায়ভিত্তিক কল্যাণরাষ্ট্র’, যেখানে সম্পদের সুষম বণ্টন, দরিদ্রের অধিকার এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ রাষ্ট্রনীতির সাথে সমন্বিত থাকবে।

অর্থনীতিতে দুই ভিন্ন দর্শন

অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় দুই দলের পার্থক্য সবচেয়ে স্পষ্ট।

বিএনপি বাজারভিত্তিক, বিনিয়োগবান্ধব অর্থনীতিতে বিশ্বাসী। তারা বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, শিল্পায়ন সম্প্রসারণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতকে শক্তিশালী করা এবং করব্যবস্থায় সংস্কারের কথা বলেছে। উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও স্টার্টআপ সংস্কৃতি গড়ে তুলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরিই তাদের কৌশল।

অন্য দিকে জামায়াত সুদমুক্ত বা ইসলামী অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দেয়। তাদের প্রস্তাব- সুদভিত্তিক ঋণের বিকল্প ব্যবস্থা, অংশীদারত্বভিত্তিক বিনিয়োগ, জাকাত ও দানভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা তহবিল। তাদের মতে, মুনাফাকেন্দ্রিক পুঁজিবাদী অর্থনীতি বৈষম্য বাড়ায়; তাই ন্যায়ভিত্তিক বণ্টন জরুরি।

ফলে বিএনপি যেখানে আধুনিক বাজারব্যবস্থার কাঠামোর মধ্যে সংস্কার চায়, জামায়াত সেখানে আদর্শভিত্তিক বিকল্প মডেল তুলে ধরে।

কর্মসংস্থান : শিল্পায়ন বনাম স্বনির্ভর উদ্যোগ

যুবসমাজের বেকার, দুই দলের ইশতেহারের অন্যতম কেন্দ্রীয় বিষয়।

বিএনপি বড় পরিসরে কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা বলেছে। শিল্পাঞ্চল সম্প্রসারণ, বিদেশী বিনিয়োগ, উদ্যোক্তা ঋণ ও কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ব্যাপক চাকরির প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে।

জামায়াতের কৌশল কিছুটা ভিন্ন। তারা ক্ষুদ্র ব্যবসা, সমবায়ভিত্তিক উৎপাদন, গ্রামীণ উদ্যোগ ও নৈতিক উদ্যোক্তা তৈরির ওপর জোর দেয়; অর্থাৎ রাষ্ট্রনির্ভর চাকরির চেয়ে সমাজনির্ভর কর্মসংস্থান কাঠামোকে তারা বেশি কার্যকর মনে করে।

কৃষি ও গ্রামবাংলা : মিলের জায়গা

কৃষি খাতে দুই দলের অবস্থানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিল দেখা যায়।

বিএনপি ‘ফার্মার কার্ড’, সহজ ঋণ, ভর্তুকি ও আধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যাতে কৃষক ন্যায্যমূল্য পায়।

জামায়াত কৃষিভিত্তিক সমবায়, স্থানীয় বাজার শক্তিশালী করা এবং মধ্যস্বত্বভোগী কমানো এবং সর্বস্তরে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দেয়।

দুই দলই কৃষিকে জাতীয় অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে দেখলেও বাস্তবায়নের পদ্ধতিতে পার্থক্য রয়েছে।

শিক্ষা : প্রযুক্তি বনাম নৈতিকতা

বিএনপি শিক্ষাকে দক্ষতা ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে চায়। কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, ডিজিটাল ক্লাসরুম, মাল্টিমিডিয়া সুবিধা ও আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিয়েছে।

জামায়াতের মতে, দক্ষতার পাশাপাশি নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ শিক্ষাব্যবস্থায় সমান গুরুত্বপূর্ণ। তারা এমন একটি শিক্ষাকাঠামো চায় যেখানে জ্ঞান ও চরিত্র গঠন কারিগরি সক্ষমতা অর্জনের একসাথে এগোবে।

সামাজিক সুরক্ষা : রাষ্ট্র বনাম সমাজ

দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সহায়তায় বিএনপি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির মাধ্যমে সরাসরি নগদ বা খাদ্যসহায়তা দেয়ার পরিকল্পনা করেছে।

জামায়াত জাকাত, দান ও সামাজিক সহায়তার নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করার কথা বলে- যেখানে সমাজই দরিদ্রের পাশে দাঁড়াবে।

এখানে একটি রাষ্ট্রকেন্দ্রিক কল্যাণনীতি, অন্যটি সমাজকেন্দ্রিক।

শাসন ও দুর্নীতি : আইনি বনাম নৈতিক সমাধান

বিএনপি নির্বাচন কমিশন, দুদক ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং ডিজিটাল স্বচ্ছতার মাধ্যমে দুর্নীতি কমানোর কথা বলে।

জামায়াত দুর্নীতিকে নৈতিক অবক্ষয়ের ফল হিসেবে দেখে; তাই সুশাসনের পাশাপাশি কঠোর ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চার মাধ্যমে সমাধান খোঁজে।

বিশ্লেষকদের মতে, একটি পদ্ধতি প্রাতিষ্ঠানিক, অন্যটি প্রাতিষ্ঠানিকতার পাশাপাশি নৈতিক-সাংস্কৃতিকও।

বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিএনপির প্রস্তাবিত কর্মসূচি বাস্তবায়নে বড় বাজেট ও শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামো প্রয়োজন। আর জামায়াতের প্রস্তাবিত নৈতিক ও আদর্শভিত্তিক অর্থনীতি বাস্তবায়নে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও কাঠামোগত রূপান্তর দরকার।

দুই পথই চ্যালেঞ্জপূর্ণ। এক দিকে বাস্তবায়ন সক্ষমতা, অন্য দিকে আদর্শের প্রয়োগযোগ্যতা- এই দুই প্রশ্নই সামনে আসছে।

ভোটারদের সামনে পছন্দ

সব মিলিয়ে স্পষ্ট-বিএনপি ও জামায়াতের ইশতেহার শুধু প্রতিশ্রুতির তালিকা নয়; বরং দু’টি ভিন্ন রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন।

একটি মনে করে প্রতিষ্ঠান ঠিক করলেই রাষ্ট্র ঠিক হবে। অন্যটি মনে করে, মানুষ ঠিক হলেই প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র ঠিক হবে।

কোন দর্শন ভোটারদের বেশি আকৃষ্ট করে, সেটিই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপথ।

এই নির্বাচনে লড়াই কেবল দলগত নয়, বরং ধারণাগতও। প্রশাসনিক সংস্কার বনাম নৈতিক পুনর্জাগরণ- দু’টি ভিন্ন পথের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হবে ভোটারদের।

দেশের রাজনীতি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রয়োজন। বিএনপি ও জামায়াত- দুই দলই সেই দিকনির্দেশনার দাবি করছে।

শেষ পর্যন্ত জনগণের রায়ই বলে দেবে- বাংলাদেশ কোন পথে হাঁটতে চায়।
 

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)