গণভোট অধ্যাদেশের উদ্দেশ্য পূরণ হয়ে গেছে। তাই সেটিকে নতুন করে বিল আকারে এনে আইনে পরিণত করার প্রয়োজন নেই, বলেন সালাহউদ্দিন আহমদ।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই শেষে বিশেষ কমিটি আগামী ২ এপ্রিল সংসদে প্রতিবেদন দেবে। তবে যে গণভোট অধ্যাদেশের অধীনে ইতোমধ্যে গণভোট হয়েছে সেটি বিল আকারে সংসদে তোলা হচ্ছে না।
রোববার রাতে জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে বিশেষ কমিটির বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়।
বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, গণভোট অধ্যাদেশের উদ্দেশ্য পূরণ হয়ে গেছে। তাই সেটিকে নতুন করে বিল আকারে এনে আইনে পরিণত করার প্রয়োজন নেই।
“গণভোট অধ্যাদেশের ব্যবহার হয়ে গেছে। যে কারণে প্রণয়ন করা হয়েছিল। এটার অধীনে সামনে আর কোনো গণভোট হবে না। এটাকে বিল আকারে এনে আইন বানানোর কোনো অর্থ নেই। এটা রেটিফিকেশনের প্রয়োজন নেই।”
আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামানও গণভোট অধ্যাদেশ নিয়ে একই রকম কথা বলেন।
আরেক প্রশ্নে তিনি বলেন, “গণভোট অধ্যাদেশতো ল্যাপস হয়ে গেছে, মানে ইনফ্যাকচুয়াস হয়ে গেছে। গণভোট অধ্যাদেশের তো আর কার্যকারিতাই নাই। ওইটার আন্ডারে একটা গণভোট হয়েছিল। সেটা তো কার্যকারিতা নাই।”
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “না, না, গণভোট শেষ হয়ে গেছে।”
তবে কমিটির আরেক সদস্য জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম খান গণভোট অধ্যাদেশ সংসদে না তোলার সিদ্ধান্তে আপত্তি দেওয়ার কথা বলেছেন।
তিনি বলেন, “গণভোটের সাথে গোটা জাতি জড়িত। ওনারা এটি বাতিল করার কথা বলছেন, যা আমরা প্রত্যাখ্যান করেছি।
“যদি গণভোট সংবিধান বহির্ভূত হয়, তবে একই দিনে হওয়া জাতীয় সংসদ নির্বাচন কীভাবে বৈধ হয়? জনগণ 'হ্যাঁ' জয়যুক্ত করেছে, সুতরাং গণভোটের রায় কার্যকর করতে হবে, এটাই আমাদের মূল দাবি।”
গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দীর্ঘ এক বছরের আলোচনা, সংলাপ ও তর্কবিতর্কের পর রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগগুলো নিয়ে জাতীয় সনদ চূড়ান্ত করা হয়, যা স্বাক্ষর হয় গত বছরের ১৭ অক্টোবর। তবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, তা নিয়ে দলগুলোর মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়।
এরপর গতবছর ১৩ নভেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই গণভোট আয়োজনের সময় দিয়ে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করা হয়। আর গণভোট আয়োজনে জারি করা হয় গণভোট অধ্যাদেশ।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশে বলা হয়, গণভোটে হ্যাঁ বিজয়ী হলে এই আদেশ জারির পর অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ীদের সমন্বয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে, যা সংবিধান সংস্কার বিষয়ে সব ধরনের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে। সেজন্য নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা আলাদাভাবে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেবেন।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব সংবিধান সংস্কার পরিষদের ওপর বর্তানোর কথা ছিল। কিন্তু নির্বাচনে দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয় পাওয়া বিএনপির নির্বাচিতরা ১৭ ফেব্রুয়ারি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নিয়ে কেবল সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলে শুরুতেই জটিলতা দেখা দেয়।
এবার গণভোটের এ অধ্যাদেশ বিল না করার সিদ্ধান্ত এল।
রোববারের বিশেষ কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীনের সভাপতিত্বে হওয়া এ বৈঠক ছিল কমিটির তৃতীয় দিনের বৈঠক।
বৈঠকের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য রফিকুল সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।
তারা বলেন, ১৩৩টি অধ্যাদেশের প্রতিটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে কিছু যেভাবে আছে সেভাবেই বিল আকারে আনা হবে, কিছু সংশোধিত আকারে সংসদে তোলা হবে। কিছু বর্তমান অধিবেশনে আনা সম্ভব না হলে পরে নতুন করে বিল আকারে আনা হবে।
বৈঠকের বিষয়ে সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈঠকে দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন) অধ্যাদেশ, বাংলাদেশ ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন) অধ্যাদেশ, তথ্য অধিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ফৌজদারি কার্যবিধির দ্বিতীয় সংশোধন অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত একাধিক অধ্যাদেশ, গণভোট অধ্যাদেশ, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা-সংক্রান্ত সংশোধনী অধ্যাদেশ, মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন অধ্যাদেশ, মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্কের দ্বিতীয় সংশোধন অধ্যাদেশ, রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, কাস্টমস (সংশোধন) অধ্যাদেশ, আয়কর (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা হয়।
এসব অধ্যাদেশের ‘প্রয়োজনীয়তা ও যথার্থতা পরীক্ষা-নিরীক্ষা’ করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রতিবেদন আকারে উপস্থাপনে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়।
তবে বিজ্ঞপ্তিতে সংসদে উপস্থাপনের জন্য অধ্যাদেশগুলোর যে তালিকা দেওয়া হয় তাতে গণভোট অধ্যাদেশের নাম নেই।
গণভোট অধ্যাদেশ নিয়ে সরকার কী বলছে
আলোচিত এ অধ্যাদেশকে আইন করার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যাওয়ার কথা তুলে ধরে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “দুই তারিখে বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনটা প্রদান করা হবে সংসদে। তো, সেজন্য ১৩৩টা অধ্যাদেশের ব্যাপারে প্রত্যেকটার ব্যাপারে আলোচনা করেছি। এখানে অনেকগুলো অধ্যাদেশ যেভাবে আছে সেভাবে পাস করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত। কিছু কিছু অধ্যাদেশ সংশোধিত আকারে বিল আনা হবে সেই হিসাবে।
“আর কিছু কিছু অর্ডিনান্স হয়তো আলোচনা করার, বিল আনার বা সংশোধিত আকারে আনার সময় পাব না। কারণ সময়টা ১১/১২ দিন আছে। আগামী ১০ তারিখের ভেতরে সময়টা শেষ হয়ে যাবে। তো সেজন্য সেই সমস্ত অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে আমাদের একটা চিন্তাভাবনা আছে।”
সেসব অধ্যাদেশ পরের অধিবেশনে আনা হতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, “সবার মতামত হচ্ছে পরবর্তী সেশনে যেগুলো পাস করতে চাইবো বিল আকারে নিয়ে আসব।”
বিরোধী ও সরকারি দলের সদস্যদের ভিন্নমতও প্রতিবেদনে থাকবে বলে তুলে ধরেন তিনি।
তার ভাষায়, “এ সমস্ত সিদ্ধান্ত আর কিছু কিছু বিষয় যেহেতু বিশেষ কমিটিতে বিরোধীদলীয় কয়েকজন সদস্য আছেন তাদের মতামত এবং সরকারি দলের কয়েকজন সদস্য আছেন তারা কিছু কিছু ব্যাপারে অধ্যাদেশের বিষয়ে তাদের নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে সেটা রিপোর্টে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হবে।”
কোনো আইনই শেষ পর্যন্ত বাতিল হবে না: আইনমন্ত্রী
আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, বিশেষ কমিটি সব অধ্যাদেশ পর্যালোচনা করেছে। তবে সময়ের সীমাবদ্ধতায় সবগুলো বর্তমান অধিবেশনেই তোলা সম্ভব নাও হতে পারে।
“১৩৩টা আইনের উপরে আজকে বিশেষ কমিটির থরো ডিসকাশন হওয়ার পরে কোন আইনগুলো রাখব, কোন আইনগুলো পরবর্তীতে, কোনোটাই বাদ যাবে না, পরবর্তীতে নতুন করে আরও বেশি যাচাই-বাছাই করে আনব, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
তিনি বলেন, “১৩৩টা আইনের মধ্যে কোনো আইনই আমরা মনে করছি না যে শেষ পর্যন্ত বাতিল হবে। যেগুলো আপাতত এই সেশনে আনব না, আমরা আরও বেশি যাচাই-বাছাই করে স্টেকহোল্ডারদের সাথে কথা বলে তারপর এটাকে নতুন বিল আকারে আমরা সংসদে আনব।”
কতগুলো অধ্যাদেশ এখন আনা হবে আর কতগুলো পরে, সেই সংখ্যা তিনি বলেননি।
তিনি বলেন, “সেটা অনেস্টলি বলি আপনাকে, কতগুলো এটা আমাদের কারোরই হিসাব নাই। কারণ আমরা নোট নিয়েছি, রিপোর্টের মধ্যে পাবেন।”
কমিটির প্রতিবেদন ২ এপ্রিলের মধ্যে জমা দেওয়ার পর পরবর্তী প্রক্রিয়াও ব্যাখ্যা করেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, “এই দুই তারিখের মধ্যে আমাদের কমিটির রিপোর্ট দিয়ে দেওয়া হবে। কমিটির রিপোর্ট যাওয়ার পরে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো এই আইনগুলোকে বিল আকারে ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। আইন মন্ত্রণালয় সেটা ভেটিং করার পরে আমরা এটা প্লেস করে দেব পার্লামেন্টে। এরপরে পার্লামেন্ট ডিসাইড করবে।”
যেগুলো এখন সংসদে তোলা হবে না, সেগুলো ল্যাপস হবে বলেও তুলে ধরেন তিনি। বলেন, “যেগুলো আমরা প্লেস করব না, সেগুলো ল্যাপস হয়ে যাবে।”
১৪ থেকে ১৫ বিষয়ে আপত্তি জামায়াতের
বৈঠক শেষে বিশেষ কমিটির সদস্য জামায়াতের এমপি রফিকুল ইসলাম খান বলেন, কয়েকটি মৌলিক বিষয়ে জামায়াতের সদস্যরা আগে থেকেই একমত ছিলেন না, এখনও নন।
“আজকে বলা যায় সব বিষয়ই আলোচনা হয়েছে। মৌলিক কিছু বিষয়ে আমরা তো আগে থেকেই একমত ছিলাম না, আজকেও একমত হই নাই। ওনাদের সংখ্যা যেহেতু বেশি ওনারা কিছুটা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরেই তারা পাস করার চেষ্টা করেছে। আমরা নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছি।”
কতগুলো বিষয়ে মতবিরোধ আছে, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “২৬টা। তো এর মধ্যে আমরা ১৪-১৫টা একমত হইনি। যেটাতে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছি। এবং এটা সংসদে যাবে, সংসদে আবার আলোচনা হবে।”
রফিকুল ইসলাম খান বলেন, বিশেষ করে মানবাধিকার কমিশন, পুলিশ কমিশন, গুম-খুন প্রতিরোধ কমিশন, সুপ্রিম কোর্টের পৃথক সচিবালয়, বিচারপতি নিয়োগের বাছাই ব্যবস্থা এবং দুর্নীতি দমন কমিশন নিয়ে তাদের আপত্তি আছে।
সংসদ সচিবালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈঠকে আরও অংশ নেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম, সংসদ সদস্য মুহাম্মদ ওসমান ফারুক, এ এম মাহবুব উদ্দিন, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী, মুহাম্মদ নওশাদ জমির, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, মুজিবুর রহমান, রফিকুল ইসলাম খান এবং জি এম নজরুল ইসলাম অংশ নেন।
বিশেষ কমিটির আমন্ত্রণে মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান বৈঠকে অংশ নেন।