Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ডিজিটাল, নাকি ডিজিটালাইজড

প্রফেসর ড. মো. মাহমুদুল হাছান প্রফেসর ড. মো. মাহমুদুল হাছান
প্রকাশ : শনিবার, ১৭ অক্টোবর,২০২৬, ১১:৩০ পিএম
আপডেট : রবিবার, ১৮ অক্টোবর,২০২৬, ১২:১৬ এ এম
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ডিজিটাল, নাকি ডিজিটালাইজড

প্রফেসর ড. মো. মাহমুদুল হাছান ছবি: ধ্রুব নিউজ

একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায়ও প্রযুক্তির ব্যবহার এক বৈপ্লবিক রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এবং জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী 'জাতীয় নবজাগরণ'-এর প্রেক্ষাপটে শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক করার তাগিদ আরও তীব্র হয়েছে।

তবে শিক্ষাঙ্গনে প্রযুক্তির সংযুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দুটি শব্দ প্রায়ই আমাদের সামনে আসে; 'ডিজিটাল শিক্ষা' (Digital Education) এবং 'ডিজিটালাইজড শিক্ষা' (Digitalized Education)।

আপাতদৃষ্টিতে শব্দ দু’টিকে সমার্থক মনে হলেও এদের তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক দর্শনে রয়েছে বিশাল ব্যবধান। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমরা আসলে কোন পথে হাঁটছি এবং আমাদের কোন পথটি বেছে নেওয়া উচিত, তা একটি সুনির্দিষ্ট যৌক্তিক ও প্রায়োগিক বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

ডিজিটালাইজড শিক্ষা (Digitalized Education) হলো এটি কেবল একটি মাধ্যমের রূপান্তর। এটি মূলত অ্যানালগ বা প্রথাগত শিক্ষা উপকরণের প্রযুক্তিগত রূপান্তর। অর্থাৎ, সনাতন শিক্ষা পদ্ধতির কাঠামোকে অপরিবর্তিত রেখে কেবল তার বাহ্যিক মাধ্যমটিকে ডিজিটাল উপাদানে বদলে দেওয়া।

আরও পড়ুন-

শিশুদের অনলাইন গেমআসক্তি দূর করতে প্যারেন্টিং কৌশল শিশুদের অনলাইন গেমআসক্তি দূর করতে প্যারেন্টিং কৌশল

ডিজিটাল শিক্ষার প্রায়োগিক রূপ হচ্ছে ক্লাসরুমে চকবোর্ড বা মার্কার বোর্ডের জায়গায় প্রজেক্টর বা স্মার্টবোর্ড বসানো, কাগজের বইয়ের পরিবর্তে পিডিএফ (PDF) বা ই-বুক পড়া, কিংবা সাধারণ খাতার বদলে ট্যাবলেটে নোট নেওয়া। করোনা মহামারী বা বিভিন্ন সংকটের সময় জুম (Zoom) বা গুগল মিটের মাধ্যমে যে ক্লাস নেওয়া হয়েছে, তা মূলত ডিজিটালাইজড শিক্ষারই অংশ। অর্থাৎ,  শিখন ও শেখানো প্রক্রিয়ায় শিক্ষাপোকরণে প্রযুক্তিগত ডিভাইস সংযুক্ত করে যে শিক্ষা নিশ্চিত করা হয়, সেটিই হলো ডিজিটালাইজড শিক্ষা।

"এটি মুখস্থবিদ্যাকে সমূলে বিনাশ করে সমস্যা সমাধানের যোগ্যতা (Problem-Solving Skills) এবং সৃজনশীলতাকে জাগ্রত করে। এখানে শিক্ষার্থীরা নিষ্ক্রিয় শ্রোতা নয়, বরং তারা নিজেরাই ল্যাবে কোডিং শিখবে, ডেটা অ্যানালিসিস করবে এবং বাস্তবমুখী প্রজেক্টের মাধ্যমে শিখবে।"

এটি মূলত একটি বাহ্যিক ভোলবদল। এখানে শিক্ষাদানের মূল দর্শন বা শিক্ষার্থীর 'ক্রিটিক্যাল থিংকিং' (Critical Thinking) ও বিশ্লেষণাত্মক ক্ষমতার কোনো গুণগত পরিবর্তন হয় না। উদাহরণস্বরূপ, যদি একজন শিক্ষক একটি সাধারণ মুখস্থনির্ভর লেকচার চক-ডাস্টারের বদলে প্রজেক্টরে পাওয়ার পয়েন্ট স্লাইডের মাধ্যমে দেখান, তবে সেটি 'ডিজিটালাইজড শিক্ষা' হবে, কিন্তু তা শিক্ষার্থীর চিন্তাশক্তির কোনো বিকাশ ঘটাবে না। এটি কেবল চক-ডাস্টারের ক্লান্তি কমায়, মেধার রূপান্তর ঘটায় না।

অপরদিকে, ডিজিটাল শিক্ষা (Digital Education) হলো শিক্ষা দর্শনের একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এটি কোনো বাহ্যিক মাধ্যমের পরিবর্তন নয়; এটি শিক্ষাদানের সামগ্রিক দর্শন ও ইকোসিস্টেমের এক আমূল সংস্কার। এখানে প্রযুক্তি কেবল একটি উপাদান নয়, বরং প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে সম্পূর্ণ পাঠ্যক্রম ও মূল্যায়ন পদ্ধতি নতুন করে ডিজাইন করা হয়।

প্রায়োগিক রূপরেখায় ডিজিটাল শিক্ষার মূল ভিত্তি হলো 'অ্যাক্টিভ লার্নিং' (Active Learning) এবং ইন্টারঅ্যাক্টিভিটি। এতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ডেটা অ্যানালিটিক্স, এবং শিক্ষামূলক বিভিন্ন সফটওয়্যার ব্যবহার করে প্রতিটি শিক্ষার্থীর মেধার ধরন অনুযায়ী আলাদা লার্নিং পাথ তৈরি করা হয়, যেটিকে আমরা পারসোনালাইজড লার্নিং (Personalized Learning) যেমন, কোনো শিক্ষার্থী যদি অংকে দুর্বল হয়, তবে সফটওয়্যার স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাকে সহজতর ধাপের মাধ্যমে ধীরে ধীরে দক্ষ করে তুলবে।

এটি মুখস্থবিদ্যাকে সমূলে বিনাশ করে সমস্যা সমাধানের যোগ্যতা (Problem-Solving Skills) এবং সৃজনশীলতাকে জাগ্রত করে। এখানে শিক্ষার্থীরা নিষ্ক্রিয় শ্রোতা নয়, বরং তারা নিজেরাই ল্যাবে কোডিং শিখবে, ডেটা অ্যানালিসিস করবে এবং বাস্তবমুখী প্রজেক্টের মাধ্যমে শিখবে।

আরও পড়ুন-

ক্যারিয়ার উন্নয়নে বহুভাষা শিক্ষা ক্যারিয়ার উন্নয়নে বহুভাষা শিক্ষা

বাংলাদেশের সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থা ও কারিকুলামের দিকে তাকালে দেখা যায়, আমরা গত এক দশকে মূলত "ডিজিটালাইজড শিক্ষা" ব্যবস্থার দিকেই বেশি ঝুঁকেছিলাম। অলিতে-গলিতে স্কুল প্রতিষ্ঠা করে ক্লাসরুমে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর বা ল্যাপটপ বসিয়েই নিজেদের 'আধুনিক' দাবি করে আসছি। কিন্তু পাঠ্যবইয়ের সেই সনাতন তথ্য ও মুখস্থনির্ভরতা অপরিবর্তিত রয়েই গেছে।

এর বিপরীতে, দেশের কিছু দূরদর্শী এবং প্রগতিশীল ইংরেজি মাধ্যম ও আন্তর্জাতিক মানের ইসলামিক ইন্টিগ্রেটেড স্কুল, যেমন 'নাফেঈন ইন্টারন্যাশনাল একাডেমি' (NIA) এবং আরো কতিপয় স্কুল ডিজিটাল শিক্ষার আসল প্রায়োগিক রূপটি বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। তারা কেমব্রিজ বা এডেক্সেল স্ট্যান্ডার্ডের সাথে মিল রেখে এমন এক ইকোসিস্টেম তৈরি করছে।  এখানে শিক্ষকেরা শুধু লেকচার দেন না, বরং শ্রেণীকক্ষে ৩০/৭০ নীতি (৩০% শিক্ষকের নির্দেশনা, ৭০% শিক্ষার্থীর নিজের কাজ ও প্রজেক্ট) অনুসরণ করা হয়। শিক্ষার্থীদের কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, বরং রোবোটিক্স, ফাইনান্সিয়াল লিটারেসি (আর্থিক সচেতনতা) এবং ডিজিটাল এটিকেট (প্রযুক্তির সঠিক ও নিরাপদ ব্যবহার)-এর মতো বাস্তবমুখী 'লাইফ স্কিলস' শেখানো হচ্ছে।

বর্তমান বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকতে হলে বাংলাদেশকে অবশ্যই 'ডিজিটালাইজড' স্তর পার হয়ে পূর্ণাঙ্গ 'ডিজিটাল শিক্ষা' ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হতে হবে। এর সপক্ষে অনেক ইতিবাচক যুক্তি রয়েছে। যেমন;

১। ডিজিটাল শিক্ষা থাকলে মেধা পাচার রোধ ও গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড অর্জন করা যায়। আমাদের শিক্ষার্থীরা যখন কেবল ডিজিটালাইজড পদ্ধতিতে পড়াশোনা করে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যায়, তখন তারা উন্নত বিশ্বের প্রকৃত ডিজিটাল ও প্রজেক্ট-ভিত্তিক ব্যবস্থার সাথে খাপ খাওয়াতে পারে না। শুরু থেকেই প্রকৃত ডিজিটাল শিক্ষার অভিজ্ঞতা থাকলে তারা বিশ্বমঞ্চে 'অলরাউন্ডার' নাগরিক হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।

‍" আমাদের প্রয়োজন এমন এক ডিজিটাল শিক্ষা ব্যবস্থা, যেখানে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর নৈতিক চরিত্র সুন্দর হবে, চিন্তাশক্তি ধারালো হবে এবং সে পুঁথিগত বিদ্যার গণ্ডি পেরিয়ে একজন দক্ষ ও মানবিক বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।"

২। ডিজিটাল শিক্ষার একটি বড় সৌন্দর্য হলো এটি বৈষম্য কমায়। একটি সুনির্দিষ্ট সফটওয়্যার বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ঢাকার নামী স্কুলের শিক্ষার্থী এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের মাদরাসা বা বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্থী; উভয়ই একই মানের আধুনিক রিসোর্স ও ডেটাবেজ ব্যবহারের সুযোগ পেতে পারে।

৩। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তির যে জোয়ার আসছে, সেখানে শুধু টাইপিং বা স্লাইড দেখতে জানা লোকগুলোকে (ডিজিটালাইজড জ্ঞানসম্পন্ন) কেউ ভালো কোনো চাকরি দেবে না। চাকরি পেতে হলে প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ ও চালনা করার মতো 'ডিজিটাল থিংকিং' বা সক্ষমতা প্রয়োজন।

পরিশেষে বলা যায়, শিক্ষাঙ্গনে শুধু ইন্টারনেটের সংযোগ দেওয়া কিংবা ল্যাপটপ বা আইপ্যাড কিনে দেওয়াই শিক্ষার আধুনিকায়ন নয়। সেটি যদি কেবল কাগজ বাঁচিয়ে স্ক্রিনে পড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা হবে ডিজিটালাইজড শিক্ষা, যা একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অপর্যাপ্ত।

আমাদের প্রয়োজন এমন এক ডিজিটাল শিক্ষা ব্যবস্থা, যেখানে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর নৈতিক চরিত্র সুন্দর হবে, চিন্তাশক্তি ধারালো হবে এবং সে পুঁথিগত বিদ্যার গণ্ডি পেরিয়ে একজন দক্ষ ও মানবিক বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। রাষ্ট্র সংস্কার এবং জাতীয় নবজাগরণের এই মাহেন্দ্রক্ষণে আমাদের শিক্ষা নীতিনির্ধারকদের বাহ্যিক চাকচিক্য (ডিজিটালাইজড) পরিহার করে অন্তর্নিহিত ও গুণগত (ডিজিটাল) শিক্ষা পদ্ধতি বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ মনোযোগ দেওয়া উচিত।

 

 লেখক: চেয়ারম্যান, এডুভেশন বাংলাদেশ এবং প্রিন্সিপাল, নাফেঈন ইন্টারন্যাশনাল একাডেমি,  ঢাকা।

 

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)