ধ্রুব নিউজ
পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। ছবি: সংগৃহীত
তৃতীয় প্রজন্মের ভিভিইআর-১২০০ মডেলের এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় কোর ক্যাচার। এটি ৯ মাত্রার ভূমিকম্প বা ১০-১২ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসেও টিকে থাকতে সক্ষম। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে কেন্দ্রটি ৮০-৯০ বছর পর্যন্ত সচল থাকতে পারবে।
মঙ্গলবার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লিতে পারমাণবিক জ্বালানি বা ইউরেনিয়ামের ব্যবহার শুরু হচ্ছে। পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার রুপ্পুরের মাধ্যমে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের চূড়ান্ত ধাপে যাত্রা শুরু করছে বাংলাদেশ। এর মধ্য দিয়ে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশের তালিকায় বিশ্বের ৩৩তম দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ।
চুল্লিপাত্রে ইউরেনিয়াম জ্বালানি বসানো হলে তা থেকে তাপ তৈরি হবে। সেই তাপে পানি থেকে বাষ্প তৈরি হয়ে টারবাইন ঘুরবে আর সেখান থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। তবে এর পরও শতাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাকি থাকবে। সবশেষে কয়েক মাস পর ধাপে ধাপে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত হবে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রায় এক যুগের প্রকল্প। এ সময়ে মহামারীর প্রভাব, বিভিন্ন দেশের যুদ্ধের ধকলসহ নানা চ্যালেঞ্জ এলেও থেমে থাকেনি প্রকল্পের অগ্রযাত্রা। দেশের প্রথম ও একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর এখন পরীক্ষামূলক উৎপাদনের দোরগোড়ায়।
তৃতীয় প্রজন্মের ভিভিইআর-১২০০ মডেলের এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় কোর ক্যাচার। এটি ৯ মাত্রার ভূমিকম্প বা ১০-১২ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসেও টিকে থাকতে সক্ষম। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে কেন্দ্রটি ৮০-৯০ বছর পর্যন্ত সচল থাকতে পারবে।
রূপপুরের দুটি ইউনিটের প্রতিটির উৎপাদন ক্ষমতা ১২০০ মেগাওয়াট। এবার প্রথম ইউনিটে জ্বালানি স্থাপন করা হচ্ছে। এই ইউনিটের পারমাণবিক চুল্লিতে বিক্রিয়ার জন্য প্রয়োজন হবে ১৬৩টি ইউরেনিয়াম বান্ডেল। প্রতিটি বান্ডেলে থাকে ১৫টি করে ইউরেনিয়াম প্লেটসমৃদ্ধ রড। দুই বছর আগেই বাংলাদেশ ১৬৮টি এমন বান্ডেল সংগ্রহ করেছে, যার মধ্যে ৫টি সংরক্ষণে রাখা হবে।
চুল্লিপাত্রে ইউরেনিয়াম জ্বালানি বসানো হলে তা থেকে তাপ তৈরি হবে। সেই তাপে পানি থেকে বাষ্প তৈরি হয়ে টারবাইন ঘুরবে আর সেখান থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। তবে এর পরও শতাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাকি থাকবে। সবশেষে কয়েক মাস পর ধাপে ধাপে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত হবে।
ইউরেনিয়াম বান্ডেল চুল্লিতে স্থাপন করতে সময় লাগবে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ দিন। এরপর ধীরে ধীরে নিউক্লিয়ার ফিশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাপ উৎপাদন করা হবে। সেই তাপে পানি বাষ্পে পরিণত হয়ে টারবাইন ঘুরাবে, যার মাধ্যমে উৎপন্ন হবে বিদ্যুৎ।
জ্বালানি প্রবেশ কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, রুশ পরমাণু শক্তি করপোরেশনের (রোসাটম) মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ। অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হবেন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম সাংবাদিকদের বলেন, ফুয়েলিং শুরু হলে এতে প্রায় ১৫ দিন সময় লাগবে। এরপর আরো প্রায় ১৫ দিন লাগবে পরীক্ষামূলক কার্যক্রমে। সব মিলিয়ে প্রায় ৩০ দিনের মধ্যে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হবে এবং এরপর প্রায় দুই মাসের মধ্যে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইউরেনিয়াম সরবরাহের পরও শতাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে। শুরুতে সীমিত পরিসরে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে এবং ধীরে ধীরে তা বাড়ানো হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ফুয়েল লোডিংয়ের মাধ্যমে এখন নিউক্লিয়ার প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। এর আগে নন-নিউক্লিয়ার সব কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার পরই এ পর্যায়ের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। ফুয়েল লোডিংয়ের পর বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হবে এবং পরীক্ষামূলকভাবে কিছু বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে ধাপে ধাপে সক্ষমতা অর্জন করা হবে।
সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী আগস্ট থেকে জাতীয় গ্রিডে পারমাণবিক বিদ্যুৎ যুক্ত হবে। তবে পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনে যেতে অপেক্ষা করতে হবে আগামী বছর পর্যন্ত।
পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের উদ্যোগের শুরুটা ১৯৬১ সালে। পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার রূপপুরে পদ্মা নদীর তীরে জমি অধিগ্রহণের কয়েক বছর পর প্রকল্পটি বাতিল করে দেয় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার। স্বাধীন দেশে এ নিয়ে আবার উদ্যোগ নেয়া হয়।
১৯৯৫ সালের জাতীয় জ্বালানি নীতিতে পারমাণবিক শক্তিকে একটি সম্ভাবনাময় বিকল্প জ্বালানি উৎস হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০১১ সালে বাংলাদেশ সরকার ও রুশ ফেডারেশন সরকারের মধ্যে একটি আন্তরাষ্ট্রীয় সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়।
চুক্তির আওতায় ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও রোসাটমের ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্টের মধ্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জেনারেল কন্ট্রাক্ট স্বাক্ষর করা হয়। চুক্তিতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ, যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও স্থাপন, কমিশনিং, পরীক্ষামূলক পরিচালনা, জনবলের প্রশিক্ষণ এবং প্রাথমিক পর্যায়ে তিন বছরের পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ধ্রুব/এস.আই