ধ্রুব ডেস্ক
ছবি: ফাইল
ফের সরকারের হাতেই যাচ্ছে বিচারপতি নিয়োগের ক্ষমতা। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বিশেষ কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের বিষয়ে সংসদে প্রতিবেদন উত্থাপন করেন। সেখানে গণভোট, দুর্নীতি দমন কমিশন অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশসহ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ২০টি অধ্যাদেশ চলতি অধিবেশনে অনুমোদন পাচ্ছে না। এর মধ্যে বাতিল করা হচ্ছে সুপ্রিম কোর্টের স্বাধীনতা সম্পর্কিত তিনটি অধ্যাদেশ। এ তিনটি অধ্যাদেশের অধীনে গৃহীত কার্যক্রমে হেফাজতের কথা বলা হয়েছে।
তবে গণভোটসহ ১৬টি অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে হেফাজতের বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। অধ্যাদেশগুলো এখনই সংসদে বিল আকারে উত্থাপন না করে পরে যাচাই-বাছাই শেষে নতুন বিল উত্থাপনের কথা বলা হয়েছে। বাকি ১১৩টির মধ্যে ৯৮টি অধ্যাদেশ হুবহু বিল আকারে উত্থাপন এবং ১৫টি সংশোধিত আকারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংসদে বিল তোলার কথা বলা হয়েছে। এসব বিষয়ে সুপারিশ করেই বিশেষ কমিটির পক্ষ থেকে প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়।
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা এসব অধ্যাদেশ সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়। পরে এগুলো যাচাই করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য জাতীয় সংসদ সরকারি দল ও বিরোধী দলের সদস্যদের সমন্বয়ে বিশেষ কমিটি গঠন করে। ১৩ সদস্যবিশিষ্ট কমিটির মধ্যে ১০ জন বিএনপির ও তিনজন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর। আরো একাধিক সংসদ সদস্য ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সচিবকমিটির আমন্ত্রণে বৈঠকে অংশ নেন। ওই কমিটি ৩টি আনুষ্ঠানিক ও একটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করে প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে। গতকালও একটি বৈঠক ডাকা হলে পরে তা বাতিল করা হয়।
১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ২০টির বিষয়ে বিশেষ কমিটিতে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর তিন সদস্য। অধ্যাদেশগুলো বাতিল ও এখনই পাসের সুপারিশ না করাসহ বিভিন্ন কারণে তারা নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন।
এদিকে বিচারপ্রতি নিয়োগ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশসহ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান অধ্যাদেশগুলো বাতিলের উদ্যোগ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন হুমকির মুখে ফেলবে বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট আইনজীবী ও সচেতন মহল। অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে করা এ অধ্যাদেশগুলো বাতিল বা সংশোধনের প্রস্তাব জুলাই বিপ্লবের চেতনার পরিপন্থী বলে তারা মতামত ব্যক্ত করেছেন।
বিশেষ কমিটির সুপারিশে বিচার বিভাগ সম্পর্কিত ৩টিসহ ৪টি অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে রহিতকরণ ও হেফাজত করতে বলা হয়েছে। এগুলো হলো, জাতীয় সংসদ সচিবালয় (অন্তর্বর্তীকালীন বিশেষ বিধান) অধ্যাদেশ, ২০২৪; সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫; সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬।
সংবিধানে বিচারক নিয়োগে আইন করার কথা থাকলেও এতদিন তা হয়নি। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমবারের মতো সু্প্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ জারি করেছিল। এতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের লক্ষ্যে উপযুক্ত ব্যক্তি বাছাইপূর্বক প্রধান বিচারপতি কর্তৃক রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ প্রদানের কথা বলা হয়। এতে বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে বিচারক নিয়োগের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি বাছাই করবে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’।
প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে স্বতন্ত্র এই কাউন্সিল যোগ্য ব্যক্তির নাম রাষ্ট্রপতি বরাবর সুপারিশ করবে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশটি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়েছে উল্লেখ করে বাতিলের সুপারিশ করা হয়। কমিটির পর্যালোচনায় বলা হয়- অধ্যাদেশ অনুয়ায়ী বিচারপতি নিয়োগে রাষ্ট্রপতির কার্যত কোনো ভূমিকা নেই। অ্যাপয়েনমেন্ট কাউন্সিলে সরকারের প্রতিনিধিত্ব খুবই কম বলে কমিটি তার পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশের বিষয়ে বাতিলের সুপারিশ করা বিশেষ কমিটির পর্যালোচনায় বলা হয়- এটি বহাল থাকলে সরকারের সঙ্গে বিচার বিভাগের কাজের কোনো সমন্বয় থাকবে না। প্রধান বিচারপতি নিম্ন আদালতের বিচারকদের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের অধিকারী হবেন। একজন ব্যক্তির একক নিয়ন্ত্রণ বিচারকদের ক্ষতির কারণ হতে পারে। ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হতে পারে। অবশ্য আইনটির পর্যালোচনায় কিছু সংশোধনীসহ পাসের কথা বলা হয়। এতে বলা হয়েছিল, বিচারকদের আর্থিক স্বাধীনতা ও উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংশোধনীসহ সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ পাস করা যেতে পারে। তবে চূড়ান্ত সুপারিশে বাতিল করার সুপারিশ করা হয়।
ধ্রুব/টিম