ধ্রুব ডেস্ক
আটক চালক সুজাত আলী ছবি: ধ্রুব নিউজ
জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট এখন আর কেবল দীর্ঘ লাইনে সীমাবদ্ধ নেই; এটি রূপ নিয়েছে সহিংসতা, মৃত্যু এবং পরিবহন ধর্মঘটে। নড়াইলে তেল দেওয়া নিয়ে বিরোধের জেরে এক ফিলিং স্টেশন ব্যবস্থাপককে ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে আলোচিত হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় জ্বালানি তেল নিয়ে বিশৃঙ্খলা অব্যাহত রয়েছে। মজুতদারি, পরিবহন স্বল্পতা, ভাড়া বৃদ্ধি, পাম্প বন্ধ এবং এমনকি নড়াইল ও উত্তরবঙ্গে পাম্প ধর্মঘটের মত ঘটনা ঘটছে।
নড়াইল সদরের তুলোরামপুরে ট্রাকচাপায় তানভীর ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক নাহিদ সরদার (৩৫) নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় তার সহকর্মী জিহাদুল মোল্যা (২৯) গুরুতর আহত হন। ফিলিং স্টেশন কর্মীদের মতে, শনিবার গভীর রাতে ট্রাকচালক সুজাত আলী তেল নিতে আসেন। সরবরাহ নিয়ে তর্কের একপর্যায়ে তিনি নাহিদকে হুমকি দেন। রাত ২টা ১০ মিনিটের দিকে নাহিদ ও জিহাদুল মোটরসাইকেলে করে স্টেশন ছাড়লে ট্রাকটি তাদের ধাওয়া করে চাপা দেয়।
পরবর্তীতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যশোর থেকে সুজাত আলীকে আটক করে। র্যাব-৬ এর কমান্ডিং অফিসার মেজর এটিএম ফজলে রাব্বি জানান, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে একটি সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে আটক করা হয়েছে।
নাহিদের মৃত্যুর প্রতিবাদে নড়াইলের সব ফিলিং স্টেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। নড়াইল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম হিটলু জানান, জেলার ১০টি পাম্প বন্ধ রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ডিলারস, ডিস্ট্রিবিউটরস, এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল সতর্ক করে বলেছেন যে, বিশৃঙ্খলা ক্রমেই বাড়ছে। তিনি লাইন ভেঙে তেল নেওয়া, রাজনৈতিক প্রভাব এবং জনসাধারণের আক্রমণাত্মক আচরণকে প্রধান উদ্বেগ হিসেবে উল্লেখ করেন। কাবুল আরও যোগ করেন, ডিপোগুলোতে সরকারের ‘ট্যাগ অফিসার’ ও বিজিবি মোতায়েনের কার্যকারিতা পেতে সময় লাগতে পারে, তবে তদারকি বৃদ্ধি পাম্প মালিকদের সাহায্য করবে।
দুএকটি বাদে যশোরের অধিকাংশ পাম্পে তেল বিক্রি চলেছে। তবে অথিকাংশ পাম্পের সামনে ছিল ধীর্ঘ সারি। তেল মজুদ থাকা শর্তেও তেল নেই নোটিশ ঝুলানোর অপরাধে গতকাল রোববার যশোরের যাত্রীক ফিলিং স্টেশনকে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমান আদালত। এর আগে শুক্রবার গভীর রাতে শহরের রজনীগন্ধা ফিলিং স্টেশনে যান জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। এসয় তিনি দেখেন তেল মজুদ থাকার পরেও তেল নেই নোটিশ ঝুলোনো রয়েছে। মন্ত্রীর উপস্থিতিতে পাম্পটি তেল বিক্রি শুরু করে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলারস, ডিস্ট্রিবিউটরস, এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক বলেন, আতঙ্কে ভোক্তাদের অতিরিক্ত কেনার প্রবণতাই মূল সমস্যা। তিনি জানান, সরকারি সরবরাহ গত বছরের বরাদ্দের মতোই রয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, কিছু পাম্প মালিক এবং সোশ্যাল মিডিয়া কন্টেন্ট ক্রিয়েটররা এই আতঙ্ক ছড়াচ্ছেন।
চট্টগ্রামে পরিবহন সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও বাসগুলো বিভিন্ন উপজেলায় বাড়তি ভাড়া আদায় করছে। কাপ্তাই রোডে ভাড়া ৩০-৪০ টাকা থেকে বেড়ে ৭০-১০০ টাকা হয়েছে। কর্ণফুলী থেকে আনোয়ারা চাতরী চৌমুহনী রুটে ভাড়া ১০০ থেকে দ্বিগুণ বেড়ে ২০০ টাকা হয়েছে। চালকরা পাম্পে দীর্ঘ সারির অজুহাত দিলেও শ্রমিক নেতারা দাবি করেছেন যানবাহনের কোনো প্রকৃত ঘাটতি নেই।
চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি বাস-মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. খোরশেদ আলম বলেন, সপ্তাহের শুরুতে যাত্রীচাপ বেশি থাকাই বিলম্বের কারণ হতে পারে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে বাস চলাচল প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে। মুরাদপুরের ফসিল পেট্রোল পাম্পে মধ্যপ্রাচ্য সংকট শুরুর পর থেকে দৈনিক অকটেন বিক্রি ২,৫০০-৩,০০০ লিটার থেকে বেড়ে প্রায় ৬,০০০ লিটার হয়েছে। সরবরাহ রেশনিং করার ফলে অনেক গ্রাহক খালি হাতে ফিরছেন। গ্রামীণ পাম্পগুলোতে সংকট আরও তীব্র, যেখানে চাহিদা চারগুণ বেড়েছে।
চট্টগ্রাম বিভাগের সদস্য সচিব মোহাম্মদ মঈন উদ্দিন জানান, বেশিরভাগ পাম্পে এখন ট্যাগ অফিসাররা তদারকি করছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এত তেল কোথায় যাচ্ছে? কারণ অনেক গ্রাহক তেল কেনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আবার লাইনে ফিরছেন।
সাতক্ষীরার পাম্পগুলোও ধুঁকছে। অনেক পাম্প বন্ধ, বাকিগুলোতে দীর্ঘ সারি। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক তাজুল ইসলাম জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সব পাম্পে অফিসার নিয়োগের কাজ চলছে।
রংপুর বিভাগের আট জেলায় শ্রমিক ইউনিয়নগুলো তিন শ্রমিকের জরিমানা ও কারাদণ্ডের প্রতিবাদে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু করায় উত্তরাঞ্চলে অস্থিরতা বেড়েছে। সকাল থেকে তেল সরবরাহ বন্ধ থাকায় দিনাজপুরের পার্বতীপুর রেলওয়ে তেল ডিপো থেকে সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে।
ফরিদপুরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রাখা দুটি পাম্পে ৫৪,০০০ লিটার ডিজেল পাওয়া গেছে। এই অপরাধে একটি প্রতিষ্ঠানকে ৫০,০০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অন্যদিকে, রোববার ভোরে খুলনার মোংলা ডিপো থেকে ১২,৬১৩ লিটার অবৈধভাবে মজুত করা ডিজেল জব্দ করেছে কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনী। কোস্টগার্ডের মিডিয়া অফিসার লেফট্যানেন্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, যমুনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের মোংলা অয়েল ইনস্টলেশনে নথিপত্রহীন এই ডিজেলের বাজারমূল্য ১২.১০ লাখ টাকা।
সূত্র : টিবিএস