ছবি: প্রতীকী
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ভোটগ্রহণের দিন সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও নিরাপত্তার নিরিখে আসনভিত্তিক ঝুঁকি চিহ্নিত করেছে পুলিশ। নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালে পাল্টাপাল্টি হামলা, সংঘাত ও নাশকতার আশঙ্কায় পুলিশের বিশেষ শাখা দেশের ১০ জেলার ১৩টি সংসদীয় আসনকে 'অতি ঝুঁকিপূর্ণ' হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
এসব আসনে থাকবে বাড়তি নজরদারি। নির্বিঘ্ন পরিবেশ বজায় রাখতে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, তা জানিয়ে মাঠ পর্যায়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ৪৫টি নির্বাচনী আসনকে মধ্যম ঝুঁকির তালিকায় রাখছে পুলিশ।
তপশিল ঘোষণার পর থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। সহিংসতার সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়েছে। এ ছাড়া এখন পর্যন্ত নির্বাচনী সহিংসতায় পাঁচজন নিহত হয়েছেন। পুলিশের হিসাবমতে, ৫০টি আসনে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বাকি আসনে উল্লেখ করার মতো কোনো সংঘাত হয়নি। সেখানে পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ।
পুলিশের তথ্যমতে, ১০ জেলার ১৩টি আসনকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় সেখানে বিশেষ নজর থাকবে। এ আসনগুলো হলো পাবনা-১ ও ৩। এ ছাড়া খুলনা-৫, পটুয়াখালী-৩, বরিশাল-৫, টাঙ্গাইল-৪, শেরপুর-৩, ঢাকা-৮, ঢাকা-১৫, ঢাকা–৭, কুমিল্লা-৪, নোয়াখালী-৬ ও চট্টগ্রাম-১৫। পুলিশের তালিকায় অতি ঝুঁকিপূর্ণ এসব আসনের কয়েকটিতে এরই মধ্যে একাধিক দফায় নির্বাচনী সংঘাত হয়েছে।
পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থী নুরুল হক নুর এবং ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হাসান মামুনের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সর্বশেষ শনিবার রাত ১১টার দিকে সংঘর্ষ হয়। গলাচিপা উপজেলার ডাকুয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর চত্রা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে এ ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের ১৫ জন কর্মী-সমর্থক আহত হন। এর আগে ২৬ জানুয়ারি পটুয়াখালীর দশমিনার পাগলা বাজারে নুরুল হক নুর ও হাসান মামুনের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে সাতজন আহত হয়েছেন। উভয় পক্ষের নির্বাচনী অফিসও ভাঙচুর করা হয়।
খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া-ফুলতলা) আসনে বিএনপির হয়ে লড়ছেন আলি আসগার লবি। এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। এখন পর্যন্ত এ আসনে বড় ধরনের সংঘাত না হলেও পুলিশের তালিকায় এটি অতি ঝুঁকিপূর্ণ। ঝুঁকির তালিকায় থাকা বরিশাল-৫ (সদর-সিটি করপোরেশন) আসনে বিএনপির প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার। এ আসনে আরও লড়ছেন ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) মনোনীত ও গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট সমর্থিত ডা. মনীষা চক্রবর্তী।
বরিশাল-৫ আসনে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো সংঘাত হয়নি। তবে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের আয়োজনে সংলাপ অনুষ্ঠানে বিএনপি ও ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের মধ্যে হাতাহাতি হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-৪ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেন না। তার প্রার্থিতা ফিরে পেতে করা লিভ টু আপিল খারিজ করে দিয়েছেন আপিল বিভাগ। এ আসনে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ নির্বাচনে লড়ছেন। তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন গণঅধিকার পরিষদ মনোনীত প্রার্থী মো. জসীম উদ্দিন (ট্রাক প্রতীক), ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের প্রার্থী ইরফানুল হক সরকার (আপেল), খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মোহাম্মদ মজিবুর রহমান (দেওয়াল ঘড়ি) এবং ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মো. আব্দুল করিম (হাতপাখা)।
পাল্টাপাল্টি উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়, ডিম ছোড়ার ঘটনায় এরই মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রে ঢাকা-৮ আসন। বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী মির্জা আব্বাস ও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী লড়ছেন শাপলা কলি প্রতীকে। লাঙ্গল নিয়ে মাঠে রয়েছেন জাতীয় পার্টির মো. জুবের আলম খান। ঢাকা-৮ আসনটি রাজধানীর রমনা, শাহবাগ, মতিঝিল, কাকরাইল, মগবাজারের অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সচিবালয় এ এলাকায় হওয়ায় আসনটিকে দেশের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রস্থল বলা যায়। এ ছাড়া ঢাকা-১৫ আসনটি অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করছে পুলিশ। প্রচারণায় জমে উঠেছে এই আসন। আসনটিতে বিএনপির প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন এবং জামায়াতের হয়ে লড়ছেন দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান।
চট্টগ্রাম-১৫ আসনের বিএনপিদলীয় প্রার্থী নাজমুল মোস্তফা আমিন বলেন, ‘সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসনে কেন্দ্র দখলের পাঁয়তারা করছে প্রতিপক্ষ দল। প্রশাসনকে প্রকাশ্যে হুমকি দিয়েছে তারা। তাই এ আসনে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিয়ে আলাদা করে ভাবতে হবে প্রশাসনকে।’
বরিশাল-৫ আসনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম বলেন, ‘বিএনপির আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, তারা পুরোনো বন্দোবস্ত নতুন করে চালু করতে চায়। ২০০১ সালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সন্ত্রাস করেছে তারা। আওয়ামী লীগ আমলের নির্বাচনের কথা সবাই জানেন। কয়েক দিন আগে শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে একটি টিভি সংলাপ অনুষ্ঠানে বিএনপিকর্মীরা ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের ওপর হামলা করেছে। এর পর থেকে বিএনপি নিয়ে আতঙ্ক আরও ছড়িয়েছে।’ মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় মজিবর রহমান সরোয়ারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বরিশাল-৫ আসনে বিএনপির মিডিয়া সেলের প্রধান আনোয়ারুল হক তারিন বলেন, ২০০১ সালের নির্বাচনের দিন চরমোনাই ইউনিয়নের একটি কেন্দ্রে পীরের লোকজন হামলা করে মজিবর রহমান সরোয়ারকে রক্তাক্ত জখম করেছে। আমরা চরমোনাই ইউনিয়নের প্রতিটি কেন্দ্র অতি ঝুঁকিপূর্ণ মনে করি। বরিশাল-৫ আসনে বাসদের প্রার্থী ডা. মনীষা চক্রবর্তী বলেন, ‘দেশের ৩০০ আসনই ঝুঁকিপূর্ণ। সরকার মব সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ। তারা কীভাবে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করবে– আমার বোধগম্য নয়। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঠুঁটো জগন্নাথের ভূমিকায় আছে। ভোটের দিন কেন্দ্রে সন্ত্রাস হলে তারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে বলে মনে হয় না।’
খুলনা-৫ আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘নির্বাচনী পরিবেশ দিন দিন খারাপ হচ্ছে। এলাকার হিন্দু ও নারীদের ভয় দেখানো হচ্ছে। ডুমুরিয়ার মঠবাড়িয়ায় আমার উঠান বৈঠক হতে দেয়নি। ফুলতলায় প্রচারে বাধা ও নারীদের হুমকি দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন মাধ্যমে সংবাদ পেলাম, তিন দিন আগে আওয়ামী লীগের পলাতক সন্ত্রাসীদের এলাকায় এনে গোপন বৈঠক করা হয়েছে। অবৈধ অস্ত্র মজুত করা হচ্ছে। জিততে না পারলে কেন্দ্র দখলের আওয়াজ দিচ্ছে প্রতিপক্ষরা। নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন এসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে নির্বাচনের পরিবেশ ব্যাহত হবে।’
পুলিশের হিসাবে সংঘাতের আশঙ্কা থেকে মধ্যম ঝুঁকিতে যেসব আসন তালিকায় রয়েছে তা হলো– পঞ্চগড়-১, ঠাকুরগাঁও-১, ঠাকুরগাঁও-৩, লালমনিরহাট-১, রংপুর-৩, রংপুর-৪, গাইবান্ধা-৫, বগুড়া-২, বগুড়া-৪, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩, রাজশাহী-১, রাজশাহী-২, নাটোর-১, সিরাজগঞ্জ-৪, কুষ্টিয়া-১, কুষ্টিয়া-৩, চুয়াডাঙ্গা-১, ঝিনাইদহ-৩, ঝিনাইদহ-৪, যশোর-২, খুলনা-৪, সাতক্ষীরা-১, বরগুনা-২, পটুয়াখালী-২, ভোলা-১, বরিশাল-৩, পিরোজপুর-২, টাঙ্গাইল-৮, ময়মনসিংহ-১০, ময়মনসিংহ-১১, নেত্রকোনা-৩, কিশোরগঞ্জ-৫, মানিকগঞ্জ-১, মুন্সীগঞ্জ-৩, ঢাকা-৭, ঢাকা-১০, নারায়ণগঞ্জ-৩, ফরিদপুর-৪, সুনামগঞ্জ-২, মৌলভীবাজার-৩, কুমিল্লা-১১, চাঁদপুর-৪, নোয়াখালী-২, চট্টগ্রাম-১৪ ও চট্টগ্রাম-১৬।
পুলিশ বলছে, ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় নিয়ে যেসব আসনের তালিকা করা হয়েছে, সেখানকার সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কোথাও ঘাটতি থাকলে তা মাঠ প্রশাসনকে অবহিত করা হবে। প্রশাসনের যারা নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত, তাদের মধ্যে সমন্বয় বৈঠক হচ্ছে। মাঠ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও ঝুঁকিমুক্ত তালিকা প্রতিনিয়ত হালনাগাদ করবে পুলিশ। অতি ঝুঁকির তালিকায় নতুন আসনের নাম যুক্ত হতে পারে। আবার অনেক আসনে সহিংসতার ঝুঁকির মাত্রা কমতে পারে।
জানুয়ারি মাসে মোট ৬৪টি নির্বাচনী সহিংসতার তথ্য দিয়েছে বেসরকারি সংস্থা মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)। এসব সহিংসতায় চারজনের মৃত্যু হয়েছে; আহত ৫০৯ জন। আর ডিসেম্বর মাসে সারাদেশে সাতটি সহিংসতায় একজনের প্রাণহানির পাশাপাশি ২৭ জন আহত হয়েছিলেন। পুলিশের হিসাব অনুযায়ী এখন পর্যন্ত ৫১টি আসনে নির্বাচনী সংঘর্ষ হয়েছে। এসব আসন হলো– পঞ্চগড়-১, লালমনিরহাট-১, চুয়াডাঙ্গা-১, বরগুনা-২, পটুয়াখালী-৩, ভোলা-১, বরিশাল-৩, টাঙ্গাইল-৮, শেরপুর-৩, নেত্রকোনা-৩, মানিকগঞ্জ-১, মুন্সীগঞ্জ-৩, ঢাকা-৮, ঢাকা-১৫, কুমিল্লা-১১, যশোর-৫, কুমিল্লা-৯, বাগেরহাট-১, খুলনা-৩, শরীয়তপুর-১, সিরাজগঞ্জ-১, ঢাকা-১২, ভোলা-৩, চট্টগ্রাম-২, ফেনী-৩, ফেনী-১, নারায়ণগঞ্জ-৪, লক্ষ্মীপুর-৩, ময়মনসিংহ-১, বগুড়া-৫, কিশোরগঞ্জ-৪, চট্টগ্রাম-১১, বরিশাল-১, মাদারীপুর-৩, ভোলা-২, ময়মনসিংহ-৯, লক্ষ্মীপুর-২, টাঙ্গাইল-১, খুলনা-২, সিরাজগঞ্জ-২, জামালপুর-৪, শরীয়পুর-২, নারায়ণগঞ্জ-২, ঢাকা-৩, ঝালকাঠি-১, চট্টগ্রাম-১, পিরোজপুর-৩, ময়মনসিংহ-২, ঢাকা-৪ ও ভোলা-৪।
পুলিশ সূত্র বলছে, যেসব কেন্দ্রে সহিংসতা বা বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা রয়েছে, সেখানে বডি-ওর্ন ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক ভিডিও ধারণ করা হবে। কোনো সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হলে সেই ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্বাচনের আগেই অতি ঝুঁকিপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে ডিএমপির অর্থায়নে বসানো হচ্ছে আরও ৬০০ ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা (সিসিটিভি)।
রাজধানীর প্রতিটি ওয়ার্ডে কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আট লাখ ৯৭ হাজার ১১৭ সদস্য দায়িত্ব পালন করবে। এর মধ্যে সেনাবাহিনী এক লাখ, বাংলাদেশ নৌবাহিনী পাঁচ হাজার, বিমানবাহিনী তিন হাজার ৭৩০, পুলিশ এক লাখ ৪৯ হাজার ৪৪৩, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী পাঁচ লাখ ৭৬ হাজার ৩১৪, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ৩৭ হাজার ৪৫৩, বাংলাদেশ কোস্টগার্ড তিন হাজার ৫৮৫, র্যাব সাত হাজার ৭০০ এবং সাপোর্ট সার্ভিস হিসেবে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের ১৩ হাজার ৩৯০ জন।