❒ মুক্তগদ্য
শিরিন সুলতানা
পৃথিবী জানে না কবিতার ভূগোল
কিন্তু কবিতা জানে পৃথিবীর ভূগোল।
কবিদের মনে কি চলে কেবল সে কবিই জানে।
তবে আজ কিছুটা জানাতে এলাম, কেন লিখি?
ছোট্ট ফুফু, বড় বোন,পাঠ্য বইয়ের বাইরে উপন্যাস আর গল্প পড়তো। অভিভাবকদের কাছ থেকে আর আমি ছোট মানুষ বলে আমার কাছ থেকে বইগুলো লুকিয়ে রাখতো, ওরা কলেজে চলে গেলে সে গুলো খুঁজে লুকিয়ে গ্রোগাসে পড়ে ফেলতাম, আর আমার আব্বা খুব বইপ্রমি এবং শিক্ষানুরাগী মানুষ ছিলেন। আমাদের বাড়ির পাশে মসজিদে ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে বই এনে পাঠাগার করলেন। মসজিদে বই রাখার ভালো জায়গা তৈরি করতে না পেরে, কিছু বই বাড়িতে এনে রেখেছিলেন; যাতে বৃষ্টিতে বইগুলো ভিজে না যায়। বাবার স্টুডেন্টলাইফে সংগ্রহ করা কিছু বই ছিলো ইতিহাসের বই। সব বই আমি ধীরে ধীরে পড়ে ফেলতাম, তখন আমি ক্লাস সেভেন, এইটে পড়ি । ওই বয়সেই শরৎচন্দ্রের বিরাজবৌ, বড়দিদি, মেজোদিদি, ডা. লুৎফর রহমানের বই, রবীন্দ্রনাথের গল্প, জীবনানন্দের কবিতাসহ আরো অনেকের উপন্যাস পড়েছি, বুখারী শরীফ, তিরমিজিসহ সহি হাদিস এমন কী কুরআনের কিছু তরজমাও তখন পড়তাম।
তারপর বড়বোনের এসএসসি পরীক্ষা চলছে আমি কেন্দ্রে গিয়েছি পরীক্ষা দেখতে, বড়মামা হঠাৎ দুইবোন কে দুইটা ডাইরি কিনে দিলেন। কী সুন্দর সেই ডাইরি, ভেতরে পাতাগুলো চকচকে , ফুল-প্রজাপতি আঁকা জলরঙের এমন সুন্দর জিনিস আগে কখনও দেখিনি। মামাতো বোন বুঝিয়ে দিলো ডাইরিতে কী লিখতে হয়, কোন কলম দিয়ে লিখতে হয়। টিফিনের টাকা জমিয়ে একটা জেলপেন কিনলাম। আনন্দে প্রতিদিন বিকালে বাড়ির সামনে মাঠের একধারে নারকেলগাছের নিচে গিয়ে বসতাম এবং কিছু লেখার চেষ্টা করতাম খুব সাবধানে, এতো সুন্দর ডাইরি একটা পাতাও যেন নষ্ট না হয়। বাড়ির সামনে ফসলের মাঠে বসে উপন্যাস পড়ে প্রধান চরিত্রের নাম এবং পছন্দের সংলাপগুলো লিখে রাখতাম। একসময় দেখলাম আমি অলরেডি ৭০ টা উপন্যাস পড়ে ফেলেছি। এবার কবিতা পড়তে পড়তে মনের অজান্তেই লিখে ফেললাম নিজের কবিতা, তবে লজ্জায় কাউকে বলতাম না।
তারপর বড় হতে লাগলাম বিভিন্নভাবে বই কিনে সংগ্রহ করতাম, পড়তাম চুপিচুপি, বাবা পাঠ্য বই বাদে উপন্যাস পড়তে দেখলে ধোলাই দিতে পারে! তারপর সময়ের স্রোতে বড় হলাম অনার্স ফাস্ট ইয়ারে উঠলে প্রাইভেট শিক্ষক রফিকুল ইসলাম জানতে পারেন আমি লিখি। কবিতাগুলো ভালো লেগেছে তার। তিনি কবি ইবাদুল ইসলামের সাথে দেখা করিয়ে দিলেন এবং ইবাদুল ভাই যশোর পাবলিক লাইব্রেরির শনিবাসরীয় টেবিলে নিয়ে গেলেন। শুরু হলো নতুন যাত্রা।
সাহিত্যের ছাত্রী হবার জন্য সাহিত্যের ভেতর ডুবে গেলাম, যতোই পড়ি ততোই শব্দ, উপমা, রস, অলংকার আমার কাছে ধরা দিতে থাকলো, বুঝতে পারলাম জীবনবোধ, র্নিমল সৌন্দর্যের আকর। সাহিত্যের পাতায় পাতায় খুঁজে পেলাম বেঁচে থাকার ছন্দ আর সুখ, প্রেম, ভালোবাসা, বিরহ যন্ত্রণা, বাস্তবতা কিংবা যুদ্ধ, মানসিক শান্তি। দিনশেষে ক্লান্তচোখে সুখের জায়গা খাতা আর কলম, কবিতা আর গল্প। আহা জীবনে এলো এক অমৃত কলস, শব্দ আর উপমার খেলায় না মেতে থাকলে যেন আমি আজন্ম বধির হয়ে থাকতাম।
মানুষের ব্যথা বেদনাই হয়ে উঠলো উপজীব্য। জীবনবোধ বুঝতে, বোঝাতে, দেখতে, শুনতে, শোনাতেই লিখি। পরবর্তন বা পরিবর্জন সবকিছুর জন্য লিখি, অন্ধদের জন্য লিখি, বোবাদের জন্যও লিখি, লিখি দায়িত্ববোধ থেকে। শব্দতে বেঁচে থাকার জন্যও লিখি।
লেখক: কবি ও গদ্যকার