Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

বিদ্রোহী ও বিপ্লবী নজরুল

ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন
প্রকাশ : সোমবার, ২৫ মে,২০২৬, ০৯:১৫ এ এম
আপডেট : রবিবার, ১৭ মে,২০২৬, ০৯:২৩ পিএম
বিদ্রোহী ও বিপ্লবী নজরুল

কবি নজরুল ইসলামকে নিয়ে আমরা দুই পর্বে এই লেখাটি নিবেদন করছি। আজ পড়ুন শেষ কিস্তি। বাংলা সাহিত্যের অদম্য ও দ্রোহের কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৮৯৯ সালের ২৪ মে (১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ বঙ্গাব্দ) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবতার এই মহান অগ্রদূত ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট (১২ ভাদ্র ১৩৮৩ বঙ্গাব্দ) ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর কালজয়ী জীবন, সাহিত্যকর্ম ও চিরবিদ্রোহী চেতনার ওপর আলোকপাত করে আমাদের এই বিশেষ নিবেদন। - বি.স

বাংলা সাহিত্যের আকাশে কাজী নজরুল ইসলাম এক চির-বিদ্রোহী ও বৈপ্লবিক সত্তার নাম। তৎকালীন পরাধীন ভারতবর্ষের শৃঙ্খল মোচন, সামাজিক বৈষম্যের অবসান এবং নিপীড়িত মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তাঁর ক্ষুরধার লেখনী কাজ করেছিল এক অপ্রতিদ্বন্দী অগ্নি-অস্ত্র হিসেবে। নজরুলের ‘বিদ্রোহ’ কেবল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধেই ছিল না, বরং তা ছিল সমাজদেহে জাঁকিয়ে বসা শোষণ, জুলুম ও অন্ধ কুসংস্কারের বিরুদ্ধে এক চিরন্তন বজ্রকণ্ঠ। নিজের আপসহীন জীবন, বিপ্লবী চেতনা ও অনন্য সাহিত্য সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি হয়ে উঠেছেন বাঙালির পরম অহংকার ও অন্তহীন সাহসের প্রতীক।

১. ‘বিদ্রোহী’ কবিতার বৈপ্লবিক প্রভাব

১৯২১ সালের ডিসেম্বরে নজরুল যখন ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি রচনা করেন, তা কেবল একটি সাধারণ সাহিত্যকর্ম ছিল না; বরং তা ছিল ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে এক প্রকাশ্য ও বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধঘোষণা। এই কবিতায় তিনি নিজেকে মহাশক্তির আধার এবং চির-বিদ্রোহী হিসেবে ঘোষণা করে বলেন:

“মম শির নেহারি' আমারি নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রির!”

এই একটিমাত্র কবিতা পরাধীন বাঙালি জাতির মেরুদণ্ড সোজা করে দিয়েছিল এবং বিপ্লবীদের হৃদয়ে এনে দিয়েছিল নতুন জাগরণের পরম সাহস।

২. সশস্ত্র ও মানসিক বিপ্লবের প্রবক্তা

নজরুল কেবল ড্রয়িংরুমে বসে থাকা কবি ছিলেন না, তাঁর ব্যক্তিজীবনও ছিল চরম সংঘাতময়। তিনি প্রথম মহাযুদ্ধে অংশ নিতে সরাসরি সেনাবাহিনীতে (৪৯ নম্বর বাঙালি পল্টন) যোগ দিয়েছিলেন। এই সামরিক প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা তাঁর পরবর্তী জীবনের বিপ্লবী চিন্তাধারায় গভীর প্রভাব ফেলেছিল। তাঁর লেখনীতে ‘তরবারি’, ‘অগ্নিবীণা’, ‘বিষের বাঁশি’-র মতো শব্দগুলোর জোরালো ব্যবহার পাঠকদের মনে পরাধীনতার বিরুদ্ধে বিপ্লবের আগুন জ্বালিয়ে দিত।

৩. ব্রিটিশ সরকারের রোষানল ও কারাবরণ

নজরুলের বিপ্লবী কর্মকাণ্ড ব্রিটিশ সরকারকে কতটা আতঙ্কিত করেছিল তা স্পষ্ট বোঝা যায় তাঁর রচিত গ্রন্থগুলো নিষিদ্ধ করার হার দেখে। তাঁর ‘বিষের বাঁশি’, ‘ভাঙার গান’, ‘প্রলয়শিখা’, ‘চন্দ্রবিন্দু’ এবং ‘যুগবাণী’—এই পাঁচটি কালজয়ী গ্রন্থ তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত করেছিল। রাজদ্রোহের অভিযোগে তাঁকে দীর্ঘ সময় কারাগারে কাটাতে হয়েছিল এবং সেখানেও তিনি অনশন ধর্মঘট করে তাঁর বিপ্লবী সংগ্রাম জারি রেখেছিলেন।

৪. শোষিত শ্রেণির প্রতিনিধি

বিপ্লবী নজরুল কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতার কথাই বলেননি, তিনি সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির দাবিও তুলেছিলেন। তিনি ছিলেন মূলত শ্রমিক, মজুর, চাষী তথা শোষিত সর্বহারার কবি। তাঁর ‘কুলি-মজুর’ বা ‘রাজার দুয়ারে’-র মতো কবিতাগুলো আজও সাম্যবাদী ও মানবিক সামাজিক বিপ্লবের প্রধান প্রেরণা জোগায়।

৫. বাংলা সাহিত্য ও বাঙালির অহংকার নজরুল

কাজী নজরুল ইসলাম কেবল আমাদের জাতীয় কবিই নন, তিনি বাংলাদেশের অস্তিত্ব, সংগ্রাম এবং চেতনার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। নজরুল কেন আমাদের শ্রেষ্ঠ অহংকার, তার পেছনে রয়েছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কিছু কারণ:

 স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেরণা: বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন—সবখানেই নজরুলের গান ও কবিতা ছিল মুক্তিকামী মানুষের প্রধান শক্তির উৎস। তাঁর “কারার ঐ লৌহকবাট” বা রণসংগীত “চল চল চল” যুদ্ধক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তে ও চেতনায় গতি সঞ্চার করত।

সাম্য ও মানবিকতার প্রতিকৃতি: বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হওয়ার যে স্বপ্ন দেখে, তার মূল তাত্ত্বিক কারিগর নজরুল। তাঁর সাম্যবাদী চিন্তা আমাদের জাতীয় সংবিধানের অন্যতম মূল স্তম্ভ বা মূলনীতির (ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র) প্রধান প্রেরণা হিসেবে কাজ করে।

 সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক পরিচয়: নজরুল বাংলা সাহিত্য ও সংগীতকে বৈশ্বিক মানে উন্নীত করেছেন। তাঁর ৩০০০-এর বেশি গান (নজরুল সংগীত) আমাদের সংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ। তিনি বাংলা ভাষায় আরবি, ফারসি ও সংস্কৃত শব্দের যে নিখুঁত মিশ্রণ ঘটিয়েছেন, তা আমাদের ভাষার বৈচিত্র্য ও প্রকাশক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

 শোষিতের কণ্ঠস্বর: নজরুল চিরকাল নিপীড়িত মানুষের পক্ষে কথা বলেছেন। কৃষক, শ্রমিক, কুলি ও মেথর—যাদের সমাজ অস্পৃশ্য মনে করত, নজরুল পরম মমতায় তাদের বুকে টেনে নিয়েছেন। তিনি শিখিয়েছেন, মাথা নত না করে কীভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হয়।

 জাতীয় কবির মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি: ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কবিকে সপরিবারে ভারত থেকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন এবং তাঁকে স্বাধীন বাংলাদেশের ‘জাতীয় কবি’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেন। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অবস্থিত কবির সমাধি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে দেশপ্রেমের পরম দীক্ষা দিয়ে চলেছে।

নজরুলের শেষ ইচ্ছা

কাজী নজরুল ইসলামের শেষ ইচ্ছা ছিল তাঁর গভীর আধ্যাত্মিক বিশ্বাস এবং দেশপ্রেমের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। তাঁর একটি বিখ্যাত গানের চরণে এই অন্তিম ইচ্ছার কথা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে, যা পরবর্তীতে সফলভাবে বাস্তবায়ন করা হয়।

গানের ভাষায় শেষ ইচ্ছা

কবি তাঁর ‘মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই’ গানটির মাধ্যমে নিজের শেষ আকাঙ্ক্ষার কথা ব্যক্ত করেছিলেন। গানের কথাগুলো ছিল:

“মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই,

যেন গোর আজান শুনতে পাই।”

কবির এই ইচ্ছার পেছনে মূলত দুটি বড় কারণ ছিল:

এক. আধ্যাত্মিক সান্নিধ্য: তিনি চেয়েছিলেন মৃত্যুর পরেও যেন প্রতিদিন আজানের পবিত্র ধ্বনি তাঁর কবরের নীরবতাকে স্পর্শ করে।

দুই . সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয়: পরাধীন ভারতের কারাগার থেকে শুরু করে জীবনের নানা চড়াই-উতরাইয়ে তিনি যে ইসলামী ঐতিহ্য ও পরম সাম্যের গান গেয়েছেন, মৃত্যুর পর সেই পরিমণ্ডলেই শান্তিতে শায়িত থাকতে চেয়েছিলেন।

আরও পড়ুন-

বিলুপ্তির পথে পারিবারিক বন্ধন? বিলুপ্তির পথে পারিবারিক বন্ধন?

ইচ্ছা পূরণ

১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট (১২ ভাদ্র ১৩৮৩ বঙ্গাব্দ) কবি যখন ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তখন তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার এবং কবির পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর এই ইচ্ছাকে সর্বোচ্চ সম্মান জানানো হয়।

সমাধি: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে সমাহিত করা হয়, যা আজীবন আজানের ধ্বনি শোনার কবির সেই ইচ্ছারই এক সার্থক প্রতিরূপ।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, বিদ্রোহী ও বিপ্লবী নজরুল কেবল অতীতের এক ঐতিহাসিক চরিত্র নন, বরং তিনি বাঙালির চিরকালীন মুক্তির সংগ্রামের প্রধান চালিকাশক্তি। তাঁর রণসংগীত, অনমনীয় কবিতা ও জীবনদর্শন আমাদের আজও অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর সাহস জোগায়। জীবনের শেষলগ্নে তাঁর অন্তিম ইচ্ছা এবং তার সার্থক বাস্তবায়ন প্রমাণ করে যে, তিনি তাঁর শেকড় ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের প্রতি কতটা অনুগত ও দায়বদ্ধ ছিলেন। নজরুলের বৈপ্লবিক চেতনার মূল লক্ষ্য ছিল এমন এক বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণ, যেখানে মানুষের মানবিক মর্যাদাই হবে শেষ কথা। কবির সেই বিদ্রোহের পথ ধরেই আসুক এক নতুন, বৈষম্যহীন ও সমতাভিত্তিক আগামী পৃথিবী।

লেখক: গবেষক, বিশ্লেষক ও গ্রন্থপ্রণেতা

আরও পড়ুন-

তিন সীমান্ত রাজ্যে বিজেপি: রাজনীতিতে নতুন চ্যালেঞ্জ তিন সীমান্ত রাজ্যে বিজেপি: রাজনীতিতে নতুন চ্যালেঞ্জ

মরণজয়ী মিছিলের ৫০ বছর: ফারাক্কা বাঁধ ও অমীমাংসিত পানি রাজনীতি মরণজয়ী মিছিলের ৫০ বছর: ফারাক্কা বাঁধ ও অমীমাংসিত পানি রাজনীতি

বিশ্ব বাণিজ্য দিবস: বৈশ্বিক বাণিজ্যে তেল সংকট ও বাংলাদেশের বাণিজ্যে ইসলামী নৈতিকতা বিশ্ব বাণিজ্য দিবস: বৈশ্বিক বাণিজ্যে তেল সংকট ও বাংলাদেশের বাণিজ্যে ইসলামী নৈতিকতা

 

 

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)