❒ মুক্তগদ্য
মুনীর মুসান্না
মানুষ যেমন কোনো সঙ্গ নিয়ে বাঁচতে পছন্দ করে। আমি ও হয়তো তেমনটি চেয়েছিলাম বলেই, বই আমার বন্ধু হয়েছিলো একদিন। বিশ্বস্ত বন্ধু। ছোটবেলায় আব্বার কাছ থেকে জেনেছি তিনি ছিলেন স্কুল জীবনে মুভি দেখার পোকা। ঘটনাক্রমে একদিন যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সিনেমা হলে সেদিন মুভি চলেনি, তাই তিনি সেই টাকা দিয়ে একটি বই কিনে পড়তে বাড়ি ফিরে এলেন। সেই থেকে শুরু। বইয়ের টোটকায় সিনেমা দেখা বন্ধ হলো তার। সেই টাকা দিয়ে প্রতি সপ্তাহে একটি করে বই কেনা চলল অবিরাম।
তারপর সময় পেলেই বই কেনার নেশা তাকে পেয়ে বসলো। বাসায় শুধু বই আর বই। তাক ভরা বই। মেঝেতে বই। আলমারি ভর্তি বই। বড় টিনের বাক্সে বই। দহলিজ ঘরে বই। তাতে বই নম্বর ও কবি আনছার আলীর নিজস্ব কিছু কথা লেখা। দুর্লভ ও বিচিত্র বইগুলো ছিল তার পরম মমতায় জড়ানো। আমি যখন প্রাইমারি বৃত্তি পরীক্ষা দেবো, কঠোর শাসনে আবদ্ধ দিন কাটছে। মূলত চুরি করে এসময়ে বইয়ের সাথে বন্ধুত্ব সৃষ্টি হয়। ক্লাসের পড়া মুখস্ত হতে সময় লাগে না। অত সময় বাসায় বসে বসে কী করবো? সেই থেকে শুরু।
সেই কিশোর বেলায় রোমেনা আফাজের, দস্যু বনহুর সিরিজ, তিন গোয়েন্দা সিরিজ, অ্যারাবিয়ান নাইটস, মহাতীর্থ হিংলাজ, বিষাদ সিন্ধু-- এসব গল্প পড়ে যেমন রোমাঞ্চকর গল্পের জগতে গিয়েছি আবার একসময় বাড়িতে থাকা সে সময়ের যশোর সরকারি এম এম কলেজ, সরকারি সিটি কলেজ, যশোর আমিনিয়া মাদ্রাসা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্মরণিকায় লেখা কাঁচা হাতের বিভিন্ন লেখা দেখে সাহস করে দু'কলম লিখেও ফেলেছি চুপিসারে। বলতে গেলে এসব স্মরণিকা আমাকে সাহস দিয়েছে লেখার। কিছু না ভেবেই লেখা। ঘরে বন্দী মনে বৃষ্টি হচ্ছে লেখার উপজীব্য বিষয়। রবীন্দ্রনাথের ছেলেবেলা পড়ে অন্যরকম হতে সাহস পেয়েছি। এরপর ষষ্ঠ শ্রেণির ফাইনাল পরীক্ষা শেষে একদিন-- ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি পত্রিকায় ছোট একটা লেখা প্রকাশ হলো। নিজের প্রথম প্রকাশিত লেখা। আব্বা জেনে ফেললেন কিভাবে যেন। এ ঘটনার জন্য জানতে পারলাম আব্বার লেখক জীবনের ইতিহাস।
খুলনা বেতারের পল্লীগীতি ও ভাওয়াইয়া গানের শিল্পী কবি আনছার আলী। পাঁচশতের বেশি গান, অসংখ্য কবিতা, তিনটি বড় উপন্যাস সহ অজস্র গল্পের লেখক যশোরের কবি আনছার আলী তার মাটির ঘরে রাখা এসব মূল্যবান ফসলের ধ্বংস হলো দেয়াল চাপা পড়ে মাটির নিচে। রাঙ্গামাটিতে বেড়াতে গিয়েছিলেন সেসময়। নিজে তখন যতদিন পর আসলেন, ততদিনে কালির কলমে লেখা এসব ধুয়ে মুছে লেপ্টে গেছে। এরপর তার মনের অবস্থা কেমন ছিলো? কেউ ভাবতে পারবে? নীরবে এক গোপন সৃষ্টি অকালে দেয়াল চাপা পড়ে বিলীন হয়ে গেল। কেউ জানতে পারলোনা সাধনার সেই স্বরূপ ও অনুভূতির গল্প, কাব্য বা গানের সুর মাধুর্য হৃদয়ের ভাষা আমাদের হৃদয়ে ছাপ ফেলতে পারতো কত!
এর আগে তার ধর্মপ্রাণ পিতার কারণে বেতারের পল্লীগীতি ও ভাওয়াইয়া গানের জীবনের সমাপ্তি করতে হয়েছে। আমি যে একটা কিছু লিখতে পেরেছি এতে তার সেদিনের আনন্দ এবং বেদনার আখ্যান শুনে অলৌকিক বেদনা অনুভব করেছি। অনেক ভাবনা জগতে মন থেকে মনে স্থানান্তর হতে পারে না এভাবে। যে গোপন অথচ বিরাট এক সাধনা মাটি চাপা পড়ে আমার বুকের জমিনে
গেঁথে গেল দুই জীবন আলাপের সন্ধি, তাতে নতুন করে অন্য কোনো সময়ে জীবনের উপলব্ধি কাব্যকলায় ধরে রাখতে গভীর পণ হলো আড়ালে।
কে জানে আবছা সেসব অলৌকিক বোধের হয়ত পুনরায় আগমনী শোনাতে পারে নতুন কোনো বসন্তে। আমি তবে কি সেই বাসন্তী হাওয়ায় লিখে লিখে পাতা ভর্তি নতুন বনে পুরনো বোধের কোনো স্বপ্ন নিয়ে সাজাবো সেই পুরাতন অনুভব? কেন লিখি তবে?
" দু' চোখে দেখা জীবনের অনিয়ম,অপমান আর কষ্ট এখন আমার কাছে স্পষ্ট ছবির মতো ধরা দেয়। কিছু দৃশ্য চোখের আড়ালে থাকে, কিছু লুকিয়ে থাকে অন্তর্দৃষ্টির আড়ালে"।
সুদূরপ্রসারী দিনান্তের শেষ অবলম্বনের ছবি আঁকা আমার কাছে রঙধনু ছবি হয়েই ধরা দেয়। মন পড়ে বাতাসে খোলা জানালায় আর মুক্ত আকাশ নীলে। আমি জীবনের বহুমাত্রিক এ গল্প লিখে রাখি, যা একদিন অন্য মানুষের নিজের গল্প হয়ে উঠবে নিশ্চয়ই। জীবন বোধের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র যন্ত্রণা ফোঁড়া গলে বের হওয়ার মত উপলব্ধি এসে মুক্তি দেয় খোলা জানালায়। একেবারে দক্ষিণ দুয়ার খুলে। সেসব প্রাণের জাগরণের জন্য লিখি আমি।
সাহিত্যিক বাবার উত্তরাধিকার হিসেবে, তার হারিয়ে যাওয়া সৃষ্টির বেদনায় আপ্লূত হওয়া অলেখা দেয়ালের ওপারে কর্ম কোলাহল নীরবে আমাকে লিখতে বলে অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের মানুষের আত্মমুক্তির অনুভূতির অণু পরমাণু অন্য আলো জ্বেলে। এই অন্ধকারে আমি শুধু বাতি জ্বেলে দিই। ঝড়ের পূর্বাভাস দিই, আলো আর অন্ধকারের স্পষ্ট অবয়বে দুটি পোর্টেট একে বলে দিই এ হচ্ছে আলো আর অন্ধকারের দুই ভুবনের দুই বাসিন্দা।
লেখক: কবি ও শিশুসাহিত্যিক