ছবি: এ আই প্রণীত
হুট করে খেয়াল করে দেখবেন—চারজন বন্ধু কিংবা পরিবারের সবাই মিলে রেস্তোরাঁয় বা ড্রয়িংরুমে আড্ডায় বসেছেন। টেবিলে গরম চা আর নাস্তার প্লেট রাখা, কিন্তু ঘরের পরিবেশ একদম নিস্তব্ধ। কারোরই খেয়াল নেই পাশের জন কী বলছেন। সবাই নিজের মুঠোফোনে ব্যস্ত, আঙুল দ্রুত স্ক্রোল করে চলেছে ফেসবুক কিংবা টিকটকে। সামনাসামনি বসে থেকেও সবাই যেন যার যার আলাদা জগতে বন্দি।
এই দৃশ্য এখন আমাদের চারপাশে খুব স্বাভাবিক হয়ে গেছে। আড্ডার মাঝে প্রিয় মানুষের সামনে বসে অনবরত ফোনে মুখ গুঁজে রাখার এই ক্ষতিকর অভ্যাসটিই মনস্তত্ত্বের ভাষায় ‘ফাব্বিং’ (Phubbing)। । মূলত ‘ফোন’ (Phone) এবং অবহেলা করা বা ‘স্নাবিং’ (Snubbing) শব্দ দুটির সংমিশ্রণে তৈরি এই শব্দটি এখন নিঃশব্দে এক বিশ্বব্যাপী মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে।
মস্তিষ্কের ডোপামিন ও ফাব্বিংয়ের আদ্যোপান্ত
কেন মানুষ আড্ডার মাঝেও বারবার অবচেতনভাবে ফোন হাতে তুলে নেয়? মার্কিন মনোরোগ চিকিৎসক নিরো ফেলিসিয়ানো এর একটি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি জানান, মানুষ সাধারণত তখনই ফাব্বিং করে যখন সে সামনের মানুষের সঙ্গে চলমান কথোপকথনে সামান্য একঘেয়েমি বা স্থবিরতা অনুভব করে। ঠিক তখনই আমাদের মস্তিষ্ক নতুন কোনো উদ্দীপনা বা রোমাঞ্চ খোঁজে।
স্মার্টফোনের ছোট স্ক্রিনটি ঠিক এই জায়গাতেই আমাদের মস্তিষ্ককে কাবু করে ফেলে। একটি নতুন নোটিফিকেশন, সোশ্যাল মিডিয়ার লাইক কিংবা মেসেজের শব্দ—এগুলো মস্তিষ্ককে মুহূর্তের মধ্যে এক ধরনের তাৎক্ষণিক আনন্দের রাসায়নিক বা ‘ডোপামিন হিট’ সরবরাহ করে। ফলে মন যখনই সামান্য নিরাসক্ত বোধ করে, হাত বাড়িয়ে ফোনটি তুলে নেওয়া তখন এক স্বয়ংক্রিয় অভ্যাসে পরিণত হয়। ডাক্তার ফেলিসিয়ানোর মতে, এই অভ্যাস একদিকে যেমন মানুষের সামনাসামনি যোগাযোগের মৌলিক দক্ষতাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে, অন্যদিকে অপর পক্ষের মনে এক গভীর নিরাপত্তাহীনতা ও নিজেকে অপ্রয়োজনীয় ভাবার হীনমন্যতা তৈরি করছে।
সম্পর্কের গুণগত মান ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব
ফাব্বিং কেবল একটি সাধারণ বদভ্যাস নয়, এটি ধীরে ধীরে সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্কগুলোকে ভেতর থেকে ফাঁকা করে দিচ্ছে। প্রখ্যাত মনোবিদ ডা. সামান্থা বোর্ডম্যানের মতে, ফাব্বিং যেকোনো চমৎকার ও অর্থবহ আলোচনার গুণগত মানকে মুহূর্তের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে নামিয়ে আনে। ফোনে মগ্ন থাকা ব্যক্তিটি সামনের মানুষের গভীর কথার কোনো অর্থপূর্ণ প্রতিক্রিয়া জানাতে পারেন না; তার উত্তরগুলো হয় যান্ত্রিক, বিচ্ছিন্ন ও আবেগহীন।
দীর্ঘমেয়াদি মনস্তাত্ত্বিক গবেষণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি ‘হার্ভার্ড স্টাডি অব অ্যাডাল্ট ডেভেলপমেন্ট’-এর তথ্য উল্লেখ করে নিরো ফেলিসিয়ানো জানান, মানুষের শারীরিক সুস্থতা, দীর্ঘায়ু এবং মানসিক প্রশান্তির সঙ্গে সরাসরি সংযোগ রয়েছে গভীর ও অর্থবহ সামাজিক সম্পর্কের। আমরা যখন ফাব্বিংয়ের মাধ্যমে সেই সামনাসামনি যোগাযোগের অবমূল্যায়ন করি, তখন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউন সিস্টেম পর্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এর হাত ধরেই জন্ম নেয় দীর্ঘস্থায়ী মানসিক অবসাদ, বিষণ্নতা ও তীব্র একাকিত্ব।
ডিজিটাল আসক্তি কাটিয়ে ওঠার উপায়
এই নীরব আসক্তি থেকে বেরিয়ে আসার প্রথম এবং সবচেয়ে বড় শর্ত হলো নিজের আচরণ নিয়ে আত্মসচেতন হওয়া। নিজের অজান্তে ঘটে যাওয়া এই ভুলগুলো শুধরে নিতে ডাক্তার ফেলিসিয়ানো একটি দারুণ পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, বন্ধু, জীবনসঙ্গী বা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অত্যন্ত সততা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে হবে। প্রিয়জনকে সরাসরি প্রশ্ন করা যেতে পারে—‘আমি যখন তোমার পাশে থাকি, তোমার কি মনে হয় আমি মানসিকভাবে উপস্থিত থাকি? নাকি সহজেই অন্যমনস্ক হয়ে পড়ি?’ নিজের ত্রুটি নিজে সবসময় ধরা যায় না, তাই চারপাশের প্রিয় মানুষের সৎ মূল্যায়নই হতে পারে এই ডিজিটাল আসক্তি ভাঙার প্রথম ভিত্তি।
পাশাপাশি জীবনে কিছু কঠোর ডিজিটাল সীমারেখা বা নিয়ম তৈরি করা জরুরি। গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক আলোচনা, দাম্পত্যের একান্ত সময় কিংবা ডাইনিং টেবিলে রাতের খাবার খাওয়ার সময় ফোনটি কেবল সাইলেন্ট করে পকেটে রাখা বা চোখের আড়াল করাই যথেষ্ট নয়; ফোনটিকে সম্পূর্ণ অন্য কোনো ঘরে রেখে আসতে হবে। যখন ইয়ারপডস বা হেডফোন কান থেকে খুলে রেখে এবং ফোনকে দূরে সরিয়ে সম্পূর্ণ মনোযোগ সামনের মানুষের চোখের ভাষা, হাসিমুখ ও কুশল বিনিময়ে বিনিয়োগ করা হয়, তখন আমাদের শরীরের অতিরিক্ত উত্তেজিত স্নায়ুতন্ত্র শান্ত হয়।
প্রযুক্তির ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া মানবীয় উষ্ণতা আর প্রাণবন্ত আড্ডা ফিরিয়ে আনার একমাত্র চাবিকাঠি হলো স্ক্রিন থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ঠিক সামনে বসা মানুষটির চোখের দিকে তাকানো।