ধ্রুব নিউজ ডেস্ক
চট্টগ্রাম বন্দর ছবি: বাসস
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম তীব্রভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক বাজারে চড়া দামের কারণে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) জ্বালানি তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য আমদানির জন্য খোলা ঋণপত্রের (এলসি) পরিমাণ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬৫ শতাংশ বেড়ে ৩৭০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ২২৮ কোটি ডলার। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক ও জ্বালানি খাতের তথ্যানুযায়ী, মোট আমদানির পরিমাণ বা ভলিউম আগের মতোই অপরিবর্তিত রয়েছে; মূলত পণ্যগুলোর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণেই ঋণপত্র খোলার ব্যয় এভাবে লাফিয়ে বেড়েছে।
তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এই তিন মাসে অপরিশোধিত তেল আমদানির এলসি খোলার পরিমাণ প্রায় তিনগুণ বেড়ে ৬৩ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছর ছিল মাত্র ২০ কোটি ডলার। অন্যদিকে অন্যান্য পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য ও গ্যাসের এলসি খোলা ১১২ কোটি ডলার থেকে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ২৪০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। পাশাপাশি একই সময়ে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের এলসি নিষ্পত্তির পরিমাণও ২৬ শতাংশ বেড়ে ২৯৩ কোটি ডলারে ঠেকেছে। বিশ্বব্যাংকের হিসেব অনুযায়ী, জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের গড় দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৭ ডলারে উঠেছে, যা আগের বছরের চেয়ে ৪০ শতাংশের বেশি। একইভাবে এলএনজির গড় দামও প্রতি এমএমবিটিইউ ১১.৭৩ ডলার থেকে বেড়ে ১৪.৪৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে। সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়া এবং কাতারএনার্জি ‘ফোর্স মেজার’ বা অনিবার্য পরিস্থিতির ঘোষণা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখায় সংকট আরও জটিল হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ বাধ্য হয়ে স্পট মার্কেট থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ প্রায় ৩০ ডলার দরে এলএনজি কিনছে, যা যুদ্ধপূর্ব পরিস্থিতির তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি। আন্তর্জাতিক বাজার ও পরিবহন খরচ দ্বিগুণ হওয়ায় প্রতি বছরে জ্বালানি আমদানির পেছনে বাংলাদেশের ব্যয় ১২০০-১৩০০ কোটি ডলার থেকে বেড়ে ১৮০০ থেকে ২০০০ কোটি ডলারে পৌঁছানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি আমদানির এই রেকর্ড ব্যয় বৃদ্ধির সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি, সরকারি ভর্তুকি ও বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে। উচ্চ ব্যয়ের চাপ সামলাতে সরকার ইতোমধ্যে চারটি প্রধান পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে, যা ২০২২ সালের আগস্টের পর সবচেয়ে বড় মূল্যবৃদ্ধি এবং এর বড় একটি অংশ সাধারণ ভোক্তাদের ওপর চাপানো হয়েছে। এরপরও বাড়তি আমদানিমূল্যের কারণে সরকারের ভর্তুকির বোঝা বহুগুণ বাড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, পোশাক রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের বাইরে বৈদেশিক মুদ্রার সীমিত উৎসের কারণে এই অস্বাভাবিক আমদানিব্যয় দেশের রিজার্ভ ও টাকার মানের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করবে। সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান ও র্যাপিড-এর চেয়ারম্যান আবদুর রাজ্জাক জানান, পরিবহন, বিদ্যুৎ ও উৎপাদন খরচ বাড়ায় সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি আরও উসকে যাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাবে। সরকার বাধ্য হয়ে উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা খাত থেকে বাজেট কাটছাঁট করতে পারে। একই সঙ্গে জ্বালানি সংকট ও অস্বাভাবিক পরিচালনা ব্যয়ের কারণে থমকে গেছে নতুন বেসরকারি বিনিয়োগ, যার ফলে বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশে স্থবির হয়ে পড়তে পারে। এই চরম পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।