ভ্যানে বিক্রি হচ্ছে এই হলুদ ফল ছবি: সংগৃহীত
হলুদ রঙের থোকা থোকা ফল। দূর থেকে দেখলে দেশীয় লটকন বলে ভুল হতে পারে। হাতে নিলে অবশ্য সেই ধারণা পাল্টে যায়। লটকনের চেয়ে ফলটি কিছুটা লম্বাটে, আকারে ছোট। কামড় দিলে শক্ত শাঁসে মচমচে অনুভূতি, সঙ্গে হালকা কষ আর মিষ্টি স্বাদ।
বাজারে কয়েক দিন ধরে এমন হলুদ ফলের দেখা মিলছে। ফলের দোকান, ফুটপাত কিংবা ভ্যান—সবখানেই স্তূপ করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে ফলটি। কোথাও বলা হচ্ছে মিসরের খেজুর, কোথাও সৌদি আরব কিংবা দুবাইয়ের। তবে আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, এটা ভারত থেকে আমদানি করা কাঁচা খেজুর।
এসব খেজুরের দাম এখন আগের তুলনায় অনেক কম। কয়েক বছর আগেও বিদেশ থেকে আনা এমন খেজুর খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হতো। এখন প্রতি কেজি ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। দাম কমায় ফলটি আর কেবল অভিজাত বিপণিবিতান কিংবা নির্দিষ্ট ক্রেতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ভ্যানেও বিক্রি হচ্ছে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ক্রেতারাও কৌতূহল থেকে কিনছেন।
পুষ্টিবিদদের মতে, খেজুরে প্রাকৃতিক শর্করা, খাদ্য আঁশ, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও বিভিন্ন অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট থাকে। কাঁচা অবস্থায় খাওয়া খেজুরেও এসব পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়। তবে ফলটি মিষ্টি হওয়ায় ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের পরিমাণ বিবেচনা করে খেতে হবে।
নাম মধ্যপ্রাচ্যের, খেজুর ভারতের
খুচরা বিক্রেতাদের কেউ ফলটিকে মিসরের, কেউ সৌদি আরবের, আবার কেউ দুবাইয়ের বলে বিক্রি করছেন। যশোরে এটি ‘মিসরি হলুদ খেজুর’ নামেও পরিচিতি পেয়েছে। কিন্তু বাজারে থাকা কাঁচা খেজুরের বড় অংশ ভারত থেকে এসেছে।
একজন ব্যবসায়ী জানান, এখন প্রায় প্রতিদিন ট্রাকে করে কাঁচা খেজুর ঢুকছে। ভারত থেকে বেনাপোল স্থলবন্দর হয়ে এসব চালান বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। সেখান থেকে পণ্য যাচ্ছে চট্টগ্রাম, ঢাকা, যশোর, সিলেট ও দেশের অন্যান্য বাজারে।
একজন ব্যবসায়ী জানান, দুই বছর ধরে ভারতে কাঁচা খেজুরের ফলন ভালো হচ্ছে। আগে এ ধরনের খেজুর মূলত সৌদি আরব, মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও থাইল্যান্ড থেকে আসত। বেশির ভাগ চালান বিমানে আনা হতো। আমদানি ও পরিবহন ব্যয় বেশি হওয়ায় খুচরা বাজারে প্রতি কেজির দাম ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা পর্যন্ত পড়ত। ভারত থেকে সড়কপথে সরাসরি খেজুর আসায় এবার পরিবহন ব্যয় অনেকটাই কমেছে। সরবরাহও বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে দামে। দাম নাগালের মধ্যে চলে আসায় সাধারণ ক্রেতাদের কাছেও ফলটি জনপ্রিয় হচ্ছে।
পাইকারি বাজারে প্রতি ১০ কেজির এক ক্রেট কাঁচা খেজুর মানভেদে ১ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ভালো মানের বড় ও শক্ত ফলের দাম বেশি। ফল নরম হয়ে গেলে দাম দ্রুত কমে যায়। কোনো কোনো দিন এক ক্রেট ১ হাজার ৯০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আবার মান খারাপ হলে তা ১ হাজার ৫০০ টাকা কিংবা আরও নিচে নেমেছে।
কোন পর্যায়ে খাওয়া হয়
বাংলাদেশে খেজুর বলতে সাধারণত শুকনা কিংবা আধা শুকনা বাদামি রঙের ফল বোঝানো হয়। আজওয়া, মেডজুল, আম্বর, মরিয়ম বা শুক্কারি—বাজারে পাওয়া বেশির ভাগ খেজুরই নরম কিংবা শুকনা অবস্থায় খাওয়া হয়। হলুদ কাঁচা খেজুর সেই পরিচিত রূপের চেয়ে একেবারেই আলাদা।
বাজারে আসা এই ফলকে ব্যবসায়ীরা বারহি জাতের খেজুর বলে উল্লেখ করছেন। খেজুর পাকার কয়েকটি পর্যায় রয়েছে। ফল হলুদ বা লাল রং ধারণ করার পরও যখন শাঁস শক্ত ও মচমচে থাকে, সেই পর্যায়কে ‘খালাল’ বলা হয়। এ অবস্থাতেই বারহি খেজুর খাওয়া যায়।
খালাল পর্যায়ে ফলটি পুরোপুরি নরম হয় না। এতে কিছুটা কষ থাকতে পারে, তবে একই সঙ্গে মিষ্টি ও খাস্তা স্বাদ পাওয়া যায়। ফল আরও পাকলে শাঁস নরম হয়, রং হলুদ থেকে বাদামি হতে থাকে এবং স্বাদ প্রচলিত নরম খেজুরের মতো হয়ে যায়।
এই জাতের খেজুর সারা বছর পাওয়া যায় না। সাধারণত জুলাই থেকে অক্টোবরের মধ্যে ফল সংগ্রহ করা হয়। তবে ভারত থেকে বাংলাদেশের বাজারে সবচেয়ে বেশি সরবরাহ আসে জুলাই ও আগস্টে। ফল দ্রুত নরম হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘ সময় পরিবহন বা সংরক্ষণ করা কঠিন।
কম দামেই বেশি আগ্রহ
ব্যবসায়ীদের মতে, কাঁচা খেজুরের চাহিদা বাড়ার প্রধান কারণ এর দাম কমে যাওয়া। আগে প্রতি কেজি ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা হওয়ায় অল্পসংখ্যক ক্রেতা ফলটি কিনতেন। এখন দাম ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায় নেমে আসায় আরও বেশি মানুষ কিনতে পারছেন।
দামের পাশাপাশি ফলটির নতুন রূপও ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছে। উজ্জ্বল হলুদ রং, শক্ত শাঁস ও মচমচে স্বাদ বাংলাদেশের বেশির ভাগ ক্রেতার কাছে নতুন। প্রচলিত খেজুরের মতো এটি আঠালো কিংবা অতিরিক্ত মিষ্টি নয়। আপেল বা নাশপাতির মতো খাস্তা অনুভূতি থাকায় অনেকে ফলটি পছন্দ করছেন।
প্রথমবার অনেকেই কৌতূহল থেকে অল্প পরিমাণে কিনছেন। স্বাদ ভালো লাগলে আবার ফিরছেন। ফলে ভ্যান বিক্রেতা থেকে শুরু করে বড় ফলের দোকান—সবখানেই বিক্রি বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও ফলটির পরিচিতি বাড়িয়েছে। ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকে হলুদ কাঁচা খেজুর খাওয়ার ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। অনলাইনে দেখার পর অনেক ক্রেতা বাজারে ফলটি খুঁজছেন বলে জানান বিক্রেতারা।
ব্যবসায়ীরা জানান, ফলের বাজারে এখন আম, আপেল, মাল্টা, কমলা, নাশপাতি ও আনার থাকলেও কাঁচা খেজুর আলাদা ধরনের পণ্য হিসেবে নজর কাড়ছে। স্বল্প সময়ের জন্য পাওয়া যায় বলেও অনেকে এখনই কিনছেন।