আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুথি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক সৌদি আরব হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধের দামামা বাজছে। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি সংঘাত বেধে যাওয়ার আশঙ্কায় তীব্র উদ্বেগের মধ্যে দিন পার করছে পাকিস্তান। কেননা, এই সংঘাত চরম রূপ নিলে ইসলামাবাদকে এক মারাত্মক কূটনৈতিক ও সামরিক উভয়সংকটে পড়তে হবে। একদিকে তাদের ঘাড়ে রয়েছে সৌদি আরবের প্রতি সামরিক প্রতিশ্রুতি রক্ষার চাপ, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকাও পড়বে হুমকির মুখে। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই এই অঞ্চলে একটি ভারসাম্য বজায় রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। গত মাসেই ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতায় পৌঁছাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল ইসলামাবাদ। তবে এর পাশাপাশি গত বছর সৌদি আরবের সাথে একটি নিশ্ছিদ্র প্রতিরক্ষা চুক্তিও স্বাক্ষর করে তারা। বর্তমানে সৌদি আরবের মাটিতে হাজার হাজার পাকিস্তানি সেনা এবং পুরো এক স্কোয়াড্রন যুদ্ধবিমান মোতায়েন রয়েছে। ফলে যেকোনো মুহূর্তে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
পাকিস্তানের প্রখ্যাত নিরাপত্তা বিশ্লেষক মুহাম্মদ আমির রানার মতে, পরিস্থিতি এত দ্রুত ঘোলাটে হবে তা ইসলামাবাদের নীতিনির্ধারকরা কল্পনাও করতে পারেননি। পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের জন্য সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ হলো, ইয়েমেন সীমান্তের কাছেই তাদের সেনারা অবস্থান করছেন। হুথিদের হামলার পরিধি বাড়লে সরাসরি পাকিস্তানি সেনারাই আক্রমণের শিকার হতে পারেন। এর বাইরে লোহিত সাগর অঞ্চলে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্য বড় ধরনের হোঁচট খাবে। জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হলে পাকিস্তানসহ বিশ্বের অনেক দেশের অর্থনীতিতেই এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌদি আরবে বড় ধরনের কোনো হামলা হলে প্রতিরক্ষা চুক্তির শর্ত অনুযায়ী পাকিস্তানকে বাধ্য হয়েই এই যুদ্ধে সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়তে হবে। সাবেক পাকিস্তানি জেনারেল গুলাম মোস্তফা জানান, ইসলামাবাদের শীর্ষ নেতৃত্ব বর্তমানে সব পক্ষকে শান্ত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে হুথিরা যদি সৌদিতে আগ্রাসন অব্যাহত রাখে, তবে এই সমীকরণ পুরোপুরি পাল্টে যেতে পারে।
এই বাহ্যিক উত্তেজনার পাশাপাশি ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও গভীরভাবে চিন্তিত পাকিস্তান। দুজন সরকারি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে জানানো হয়, ইরানের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের মতো রাজনৈতিক নেতাদের সাথে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) মতবিরোধ দিন দিন বাড়ছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মুহাম্মদ আলী মনে করেন, তেহরানের যেকোনো সিদ্ধান্তে এখন সামরিক বাহিনীর প্রভাব অনস্বীকার্য, যা ইসলামাবাদ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করছে। এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে কূটনৈতিক অঙ্গনেও। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনির একটি প্রতিনিধিদলের ইসলামাবাদ সফরের কথা থাকলেও তা নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দুই দিন পিছিয়ে যায়। এই সফরে মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সমঝোতার ভবিষ্যৎ নিয়েই আলোচনা হওয়ার কথা।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে গত বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সর্বোচ্চ ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘অব্যাহত সংলাপ, কার্যকর কূটনীতি এবং পারস্পরিক যোগাযোগের কোনো বিকল্প আমাদের হাতে নেই।’
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পাকিস্তান বর্তমানে এক সূক্ষ্ম সুতোর ওপর দিয়ে হাঁটছে। আঞ্চলিক শান্তি রক্ষায় তারা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যেমন নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে চায়, ঠিক তেমনি মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা এবং সৌদির সাথে গভীর সামরিক সম্পর্কের কারণে চাইলেও নিরপেক্ষ থাকতে পারছে না।
রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এক পাকিস্তানি কর্মকর্তা নিজেদের অবস্থানের কথা জানাতে গিয়ে বলেন, ‘নানা হতাশা ও প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও আমরা মধ্যস্থতার এই প্রক্রিয়া থেকে পিছিয়ে আসছি না। এর পেছনে আমাদের বিশাল শ্রম রয়েছে এবং এই প্রক্রিয়া সচল রাখাই আমাদের জন্য লাভজনক।’ তবে মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত অপর এক শীর্ষ সূত্রের মন্তব্য পাকিস্তানের আসল বাধ্যবাধকতার চিত্রই তুলে ধরে। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ বন্ধ হওয়াটা সবার জন্যই মঙ্গলের। কিন্তু সৌদি আরব যদি বিপদে পড়ে আমাদের ডাক দেয়, তবে আমরা বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়াব—এ নিয়ে সংশয়ের কোনো অবকাশ নেই।’
সূত্র: রয়টার্স