আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ফুজেইরাহ তেল শিল্প জোনে ইরানের হামলা, ১৪ মার্চ ২০২৬। ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ চলাকালে উপসাগরীয় অঞ্চলে অন্যান্য মার্কিন মিত্রসহ সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপর টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে হামলা চালিয়ে আসছিল ইরান। এরপর নিজেদের কৌশলে পরিবর্তন আনে আমিরাত—ইরানের জন্য কয়েক বিলিয়ন ছাড় করতে রাজি হয় উপসাগরীয় ধনী দেশটি। চারটি সূত্র রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছে।
আগে অপ্রকাশিত এই খবরটি এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে বৃহত্তর দরকষাকষির চূড়ান্ত পর্ব চলছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে বিদেশি ব্যাংকগুলোতে ইরানের তেল বিক্রির হাজার হাজার কোটি ডলার আটকে আছে। কূটনীতিকেরা বলছেন, চলমান আলোচনার মাধ্যমে আটকে থাকা সেই বিপুল পরিমাণ অর্থও ছাড় করা হতে পারে।
দুটি আঞ্চলিক সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, মোট ১০ বিলিয়ন (১ হাজার কোটি) ডলার ছাড় করতে সম্মত হয়েছে আমিরাত। এর মধ্যে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ এরইমধ্যে তেহরানকে দেওয়া হয়েছে।
এ সমঝোতা সম্পর্কে অবগত আরও দুটি সূত্র জানিয়েছে, আবুধাবি তেহরানের মোট ২০ বিলিয়ন ডলার ছাড় করবে। আরব আমিরাতের ভূখণ্ডে ইরান আর হামলা করবে না—এমন শর্তেই এই বিপুল অঙ্কের অর্থ ছাড়বে আবুধাবি।
সমঝোতার বিষয়ে অবগত একটি সূত্রও জানিয়েছে, প্রথম কিস্তির ৩ বিলিয়ন ডলার ইতিমধ্যেই দিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তবে এই অর্থের উৎস আমিরাতের নিজস্ব তহবিল, নাকি আমিরাতি ব্যাংকিং সিস্টেমে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা ইরানেরই কোনো অ্যাকাউন্ট, নাকি অন্য কোনো উৎস থেকে এই অর্থ আসছে—সেটি নিশ্চিত হতে পারেনি রয়টার্স।
অবশ্য শনিবার ভোরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, ৩ বিলিয়ন ডলার হস্তান্তরের এই 'পুরো খবরটিই সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট।' তবে এর বাইরে বিস্তারিত আর কিছুই জানায়নি দেশটি।
এর আগে অর্থ হস্তান্তরের বিষয়ে রয়টার্সের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হলে আমিরাতের একজন কর্মকর্তা বলেন, উত্তেজনা কমিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাচ্ছেন তারা।
'উত্তেজনা প্রশমন এবং দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা আনাই আমিরাতের পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য। এই সংঘাতের ভয়াবহ পরিণতি থেকে গোটা অঞ্চলের মানুষকে বাঁচাতে যুক্তরাষ্ট্রের নেওয়া উদ্যোগসহ যেকোনো গঠনমূলক চেষ্টাকে আমিরাত সমর্থন করে,' বলেন তিনি।
আমিরাতে ইরান সর্বশেষ সরাসরি হামলা চালায় ৪ মে
আরব আমিরাতের এ পদক্ষেপের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি হোয়াইট হাউস।
তবে শুক্রবার ওয়াশিংটনে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কেবল চুক্তি সই বা বৈঠক করলেই ইরানের অর্থ ছাড় করা হবে না। সম্ভাব্য চুক্তিটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে তেহরান তাদের প্রতিশ্রুতিগুলো পুরোপুরি পালন করলেই কেবল অর্থনৈতিক সুবিধাগুলো পেতে পারে।
রয়টার্সের পক্ষ থেকে মন্তব্যের অনুরোধ করা হলেও ইরানি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক সাড়া মেলেনি।
বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় এ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা সূত্রগুলোর কেউই নিজেদের নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি।
এই সমঝোতা সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরানের মধ্যকার প্রকাশ্য শত্রুতার সম্পর্কে নাটকীয় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যুদ্ধের বড় অংশজুড়ে দুই দেশের মধ্যে চরম বৈরিতা বজায় ছিল। সে সময় ইরানি হামলায় দুবাইয়ের হোটেলগুলো ফাঁকা হয়ে পড়েছিল, বহু প্রবাসী দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। এছাড়া নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে আমিরাতের যে বৈশ্বিক সুনাম—যা তাদের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র হয়ে ওঠার মূল চাবিকাঠি—তা মারাত্মকভাবে ধাক্কা খেয়েছিল।
এ সমঝোতার বিষয়ে অবগত একটি সূত্র জানিয়েছে, এ পদক্ষেপ মার্কিন-ইরান সংঘাত নিরসনের ক্ষেত্রে এমন এক অভিনব উপায় তৈরি করেছে, যেখানে কোনো পক্ষকেই নিজেদের রেডলাইন পার হতে হচ্ছে না। ইরান দাবি করতে পারবে যে তারা যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ আদায় করেছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটনও যুক্তি দিতে পারবে যে তারা কোনো টাকা দেয়নি। অন্যদিকে আবুধাবি নিজেদের নিরাপত্তা ও দুবাইয়ের বাণিজ্যিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে পারছে। একইসঙ্গে পুরো বিষয়টিকে আঞ্চলিক আস্থা পুনর্নির্মাণের চমৎকার বিনিয়োগ হিসেবে তুলে ধরার সুযোগও পাচ্ছে তারা।
সমঝোতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল অন্য সূত্রটি জানিয়েছে, এই অর্থ ছাড়ের বিনিময়ে আরব আমিরাতে সব ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা বন্ধ রাখবে ইরান। পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধিসহ দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠন করা হবে।
সূত্রটি আরও জানায়, একই ধরনের সমঝোতা করতে উপসাগরীয় অঞ্চলের আরও অন্তত দুটি আরব দেশের সঙ্গে ইতিমধ্যেই যোগাযোগ করেছে ইরান।
আরব আমিরাতে ইরানের সর্বশেষ সরাসরি হামলাটি হয়েছিল এক মাসেরও বেশি সময় আগে—৪ মে ওমান উপসাগরে অবস্থিত উপসাগরীয় দেশটির ফুজাইরাহ বন্দরে।
প্রথম সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক সপ্তাহ আগেই এই আলোচনা শুরু হয়েছিল। তবে গত সপ্তাহে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কর্মকর্তারা যখন আবুধাবিতে আসেন, তখন আলোচনার গতি বেড়ে যায়। ওই সফরে তারা আরব আমিরাতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও আবুধাবির উপ-শাসক শেখ তাহনুন বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং তার গেস্ট হাউসেই অবস্থান করেন।
ওই সফরের পরপরই এই লেনদেন পদ্ধতির খুঁটিনাটি চূড়ান্ত করতে আরব আমিরাতের কর্মকর্তারা তেহরান সফর করেন।
দুবাইয়ে ইরানের বিশাল সম্পদ
আরব আমিরাত ও ইরানের এই সমঝোতা এমন এক জটিল আর্থিক পরিস্থিতিতে ঘটছে, যার সঙ্গে দুবাই সরাসরি জড়িয়ে পড়তে পারে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং তেহরানের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান লাইফলাইন এই শহর।
দুবাইয়ের ব্যাংকগুলোতে দীর্ঘদিন ধরেই ইরান-সংশ্লিষ্ট বিপুল পরিমাণ আমানত জমা রয়েছে। তবে এর বড় অংশই এখন মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় আটকে আছে। কালো তালিকাভুক্ত কোনো ইরানি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেন করলে যেকোনো বিদেশি ব্যাংককে এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় মার্কিন আর্থিক নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।
গত ১১ এপ্রিল ইরানের এক ঊর্ধ্বতন সূত্র দাবি করেন, কাতারসহ অন্যান্য বিদেশি ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করতে রাজি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যদিও এক মার্কিন কর্মকর্তা তাৎক্ষণিকভাবে এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেন।
বিষয়টির সংবেদনশীলতার কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই সূত্র রয়টার্সকে জানায়, সম্পদ অবমুক্ত করার এই বিষয়টি 'হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার সঙ্গে সরাসরি জড়িত'।