শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬
Ad for sale 100 x 870 Position (1)
Position (1)

আল-মিরাজ ও মহান প্রভুর সান্নিধ্যে

ড. মহিউদ্দীন মোহাম্মদ ড. মহিউদ্দীন মোহাম্মদ
প্রকাশ : শনিবার, ১৭ জানুয়ারি,২০২৬, ১২:০১ এ এম
আপডেট : শনিবার, ১৭ জানুয়ারি,২০২৬, ১২:৫৯ এ এম
আল-মিরাজ ও মহান প্রভুর সান্নিধ্যে

❒ আলইসরা ওয়া আল মিরাজ ছবি: ফাইল

সলামের ইতিহাসে 'ইসরা ও মি'রাজ' এক বিস্ময়কর এবং বৈপ্লবিক অধ্যায়। মহানবী মুহাম্মদ ইবন আবদুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নবুওয়াতী জীবনের এক কঠিনতম সময়ে আল্লাহ তায়ালা তাঁকে তাঁর সান্নিধ্যে তুলে নিয়ে যে সম্মান প্রদর্শন করেছেন, তার গুরুত্ব ও শিক্ষা অপরিসীম। এই যাত্রা কেবল একটি অলৌকিক ভ্রমণ ছিল না, বরং এটি ছিল ইসলামের আকিদা, ইবাদত ও নবুওয়াতের সত্যতার এক জীবন্ত দলিল।

৬২১ খ্রিস্টাব্দে ২৬ রজব দিবাগত রাতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিরাজ গমন করেন। আসলে এটি রাসূলে খোদার জীবনে একটি অলৌকিক ও মহত্বপূর্ণ ঘটনা। এদিন রাত্রিতে রাসূলে খোদা তার চাচাতো বোন উম্মু হানির বাসগৃহে অবস্থান করছিলেন। উম্মু হানি বর্ণনা করেন, আল্লাহ্‌র রাসূল রাত্রিতে আমার গৃহে অবস্থান করেন। রাত্রির প্রার্থনা সেরে তিনি ঘুমোতে যান। উষালগ্নের একটু পূর্বে তিনি জেগে উঠেন এবং আমাদের সকলকে জাগিয়ে দেন। আমরা তার সঙ্গে ফজরের নামাজ আদায় করি। ফজরের নামাজ শেষ হলে তিনি বলেন, হে উম্মু হানি, আমি এশার নামাজ তোমার সঙ্গে এখানে আদায় করেছি, তারপর আমি জেরুজালেমে বাইতুল মাকদাসে গিয়েছি। সেখানেও নামজা পড়েছি এবং এখন আমি তোমাদের সঙ্গে ফজরের নামাজ পড়লাম। উম্মু হানি উত্তরে বলেন, হে আল্লাহ্‌র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একথা আপনি কাউকে বলবেন না, তারা আপনাকে ভুল বুঝবে এবং ক্ষতি করবে। রাসূল বলেন, আল্লাহ্‌র দোহাই আমি একথা সবাইকে বলব।

এক্ষণে একটা কথা বলে নেওয়া ভালো, আবু তালিবের মৃত্যুর পর তার বিধবাপত্নী ফাতেমা ইসলাম গ্রহণ করেন। সেসঙ্গে তার কন্যা উম্মুহানিও ইসলাম গ্রহণ করেন। উম্মু হানি হচ্ছেন আলী ও জাফরের ভগ্নী। উম্মু হানির স্বামী হুবায়রা মূর্তিপূজারী ছিলেন, কিন্তু তিনি তার গৃহে রাসূলের আগমনকে কখনও বাধা দেননি। কখনও কখনও রাসূলে খোদা তার গৃহে এসে গৃহের বিশ্বাসী সদস্যদের সাথে নামাজ আদায় করতেন।

এখন আমরা বিশালগুরুত্ববহ মিরাজের কিয়দাংশ সম্পর্কে জানব-

শোকাতুর হৃদয়ে প্রশান্তি ও ঐশ্বরিক সান্ত্বনা

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন এই মহিমান্বিত যাত্রায় আমন্ত্রিত হন, তখন তিনি মানসিকভাবে অত্যন্ত কঠিন সময় পার করছিলেন। নবুওয়াতের দশম বছরে তিনি তাঁর দুই প্রধান আশ্রয়স্থল—প্রাণপ্রিয় স্ত্রী খাদিজা (রা.) এবং পরম শ্রদ্ধেয় চাচা আবু তালিবকে হারান। ইসলামের পরিভাষায় এই বছরটিকে 'আমুল হুজন' বা 'দুঃখের বছর' বলা হয়। মক্কার কুরাইশদের অত্যাচার তখন চরমে পৌঁছেছিল এবং তায়েফের ময়দানে ইসলামের দাওয়াত দিতে গিয়ে তিনি নজিরবিহীনভাবে লাঞ্ছিত ও রক্তাক্ত হন। মানসিকভাবে যখন তিনি বিষণ্ণ এবং মানুষের পক্ষ থেকে প্রত্যাখ্যাত হচ্ছিলেন, তখনই আল্লাহ তায়ালা তাঁকে তাঁর আরশে আজিমের মেহমান হিসেবে আমন্ত্রণ জানান। এই ভ্রমণের মাধ্যমে আল্লাহ প্রমাণ করেছেন যে, দুনিয়ার মানুষ তাঁকে ত্যাগ করলেও মহাবিশ্বের স্রষ্টা তাঁর সাথে আছেন। এটি ছিল মূলত তাঁর শোকাহত হৃদয়ের জন্য এক ঐশ্বরিক উপশম। আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের মাধ্যমে তিনি যে মানসিক শক্তি অর্জন করেছিলেন, তা পরবর্তী হিজরত এবং মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত গড়ে দিয়েছিল। এটি মুমিনদের শেখায় যে, বিপদে ধৈর্য ধরলে আল্লাহ অবশ্যই তাঁর রহমতের দুয়ার খুলে দেন।

নামাজের বিধান: উম্মতের জন্য পরম উপহার

মিরাজের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও বৈপ্লবিক গুরুত্ব হলো 'পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ' ফরজ হওয়া। ইসলামের অন্যান্য মৌলিক ইবাদত যেমন—যাকাত, রোজা বা হজ, জিবরাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে ওহী হিসেবে দুনিয়ায় অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু নামাজ হলো একমাত্র ইবাদত যা আল্লাহ তায়ালা সরাসরি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তাঁর আরশে ডেকে নিয়ে উপহার হিসেবে দিয়েছেন। এটি নামাজের অনন্য মর্যাদাকে ফুটিয়ে তোলে। প্রাথমিকভাবে ৫০ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হলেও মহান আল্লাহর অসীম দয়া এবং নবী মুসা (আ.)-এর পরামর্শে বারবার আবেদনের প্রেক্ষিতে তা ৫ ওয়াক্তে নির্ধারিত হয়। তবে আল্লাহ ওয়াদা করেছেন যে, ৫ ওয়াক্ত আদায় করলে ৫০ ওয়াক্তেরই সওয়াব পাওয়া যাবে। এই ঘটনাটি মুসলিমদের জন্য একটি আধ্যাত্মিক সংযোগের বার্তা দেয়। নামাজের মাধ্যমে মুমিন ব্যক্তি আল্লাহর সাথে সরাসরি কথোপকথন করে, যা অনেকটা মুমিনের জন্য মি'রাজ স্বরূপ। নামাজ কেবল একটি শারীরিক কসরত নয়, বরং এটি আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রধান মাধ্যম। মি'রাজের এই উপহারটি আজও মুসলমানদের প্রতিদিন পাঁচবার আল্লাহর দরবারে হাজিরা দেওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

 সত্য ও মিথ্যার সংঘাত

মিরাজ থেকে ফিরে আসার পর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কার কুরাইশদের কাছে এই অলৌকিক ভ্রমণের বর্ণনা দিলেন, তখন পুরো মক্কায় এক বিশাল তোলপাড় সৃষ্টি হয়। কাফেরদের জন্য এটি ছিল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে উপহাস করার এক নতুন সুযোগ। তারা মনে করেছিল, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবার এমন এক দাবি করেছেন যা কেউ বিশ্বাস করবে না। কুরাইশরা জানত যে, মক্কা থেকে সিরিয়া বা জেরুজালেমে পৌঁছাতে উটের পিঠে চড়ে কমপক্ষে এক মাস সময় লাগে। অথচ তিনি দাবি করছেন যে এক রাতের সামান্য অংশে তিনি সেখানে গিয়েছেন, নামাজ পড়েছেন এবং আকাশ ভ্রমণ শেষে ফিরে এসেছেন।

কুরাইশ নেতারা অত্যন্ত বিদ্রূপের সাথে তাঁর কথাগুলো প্রত্যাখ্যান করল। আবু জাহেল উপহাস করে লোকদের জড়ো করল এবং বলল, "তোমরা কি শুনছ তোমাদের নবী কী দাবি করছেন?" তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কঠিন সব প্রশ্ন করতে শুরু করল। বিশেষ করে যারা ইতিপূর্বে জেরুজালেমের মসজিদুল আকসা দেখেছিল, তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে পরীক্ষা করার জন্য মসজিদের খুঁটি, দরজা এবং জানালার খুঁটিনাটি বর্ণনা করতে বলল। আল্লাহ তায়ালা তখন তাঁর নবীর চোখের সামনে মসজিদের দৃশ্যটি উন্মুক্ত করে দিলেন এবং তিনি প্রতিটি প্রশ্নের নিখুঁত উত্তর দিলেন। কুরাইশরা এই অলৌকিক বর্ণনা শুনে হতবাক হয়ে গেল, কিন্তু তাদের অহংকার তাদের সত্য গ্রহণে বাধা দিল। তারা একে 'প্রকাশ্য জাদু' বলে অভিহিত করল।

এই ঘটনার মাধ্যমেই ঈমানের এক মহান পরীক্ষা হয়ে গেল। কুরাইশরা হযরত আবু বকর (রা.)-এর কাছে গিয়ে বিদ্রূপ করে বলল, "তোমার বন্ধু তো এখন অদ্ভুত দাবি করছে।" আবু বকর (রা.) কেবল একটি প্রশ্ন করলেন, "তিনি কি এ কথা বলেছেন?" তারা বলল, "হ্যাঁ।" তখন আবু বকর (রা.) এক ঐতিহাসিক ঘোষণা দিলেন— "তিনি যদি এ কথা বলে থাকেন, তবে তা ধ্রুব সত্য। আমি যদি আসমান থেকে ওহী আসার খবর বিশ্বাস করতে পারি, তবে এই ভ্রমণ কেন বিশ্বাস করব না?" এই অটল বিশ্বাসের কারণেই তাঁকে 'সিদ্দিক' উপাধি দেওয়া হয়। সুতরাং, কুরাইশদের জন্য মিরাজ ছিল বিভ্রান্তি ও শত্রুতা বৃদ্ধির কারণ, আর মুমিনদের জন্য তা ছিল ঈমানকে পর্বতসম দৃঢ় করার এক মহাসুযোগ।

নবুওয়াতের প্রমাণ ও বিশ্বাসের পরীক্ষা

ইসরা ও মিরাজ ছিল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সশরীরে ও জাগ্রত অবস্থায় এক নজিরবিহীন অলৌকিক সফর। তৎকালীন বৈজ্ঞানিক ও যান্ত্রিক সীমাবদ্ধতার যুগে এক রাতেই মক্কা থেকে জেরুজালেম এবং সেখান থেকে সাত আসমান ভ্রমণ করে ফিরে আসা ছিল সাধারণ বুদ্ধির অগম্য। এটি ছিল মূলত মুমিনদের ঈমানের এক কঠিন পরীক্ষা। যখন মক্কার কাফেররা এই ঘটনা শুনে বিদ্রূপ করছিল, তখন হযরত আবু বকর (রা.) কোনো দ্বিধা ছাড়াই এটি বিশ্বাস করেছিলেন, যার কারণে তিনি 'সিদ্দিক' উপাধি পান। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জেরুজালেমের বর্ণনা এবং কুরাইশদের একটি কাফেলার অবস্থান সম্পর্কে নিখুঁত তথ্য দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন যে তিনি কোনো স্বপ্ন দেখেননি। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, আল্লাহর কুদরত ও ক্ষমতার কাছে সময় ও দূরত্ব কোনো বাধা নয়। এটি ইসলামের সত্যতা এবং নবুওয়াতের সত্যতাকে কাফেরদের সামনে এক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড় করিয়েছিল। আজকের দিনেও এই ঘটনা মুমিনদের শেখায় যে, আল্লাহর প্রতিটি বিধান এবং ঘোষণা বিনা তর্কে মেনে নেওয়াই হলো প্রকৃত ঈমান।

আল-আকসা মসজিদের মর্যাদা ও নবীদের ইমামতি

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মি'রাজ সফরের প্রথম অংশে মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে জেরুজালেমের মসজিদুল আকসায় গমন করেন। সেখানে তিনি আদম (আ.) থেকে শুরু করে সকল নবী-রাসূলদের নিয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন এবং ইমামতি করেন। এই ইমামতির ঘটনাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন সকল নবী-রাসূলদের নেতা বা 'সায়্যিদুল মুরসালিন'। পূর্ববর্তী সকল শরীয়ত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শরীয়তের অধীনে একীভূত হওয়ার এটি ছিল একটি আধ্যাত্মিক স্বীকৃতি। এছাড়াও, এই ঘটনার মাধ্যমে মুসলমানদের কাছে মসজিদুল আকসার অনন্য মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটি ইসলামের প্রথম কিবলা এবং বরকতময় একটি স্থান। এর মাধ্যমে আরবের বাইরেও ইসলামের আধ্যাত্মিক সীমানা বিস্তৃত হয় এবং জেরুজালেম মুসলিমদের হৃদয়ে একটি বিশেষ স্থান করে নেয়। আজও ফিলিস্তিনের এই ভূমি মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র এবং মিরাজের স্মৃতিবিজড়িত স্থান হিসেবে গণ্য হয়। যদিও বিধর্মীদের অত্যচারে এই পবিত্রভূমিতে বছরের পর বছর রক্তের স্রোত বইছে সেখানে, দোজখতুল্য জীবনে অভ্যস্ত হয়ে আছে মুসলমানরা কাল-কালান্তরে।

জান্নাত-জাহান্নামের চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা ও সামাজিক শিক্ষা

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিরাজ সফরে কেবল আসমানই ভ্রমণ করেননি, বরং তাঁকে জান্নাত ও জাহান্নামের অবস্থাও দেখানো হয়েছে। তিনি জান্নাতের অফুরন্ত নিয়ামত, আল-কাওসার নদী এবং জান্নাতীদের প্রশান্তি প্রত্যক্ষ করেন। বিপরীতে, তিনি জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তিও দেখেন। তিনি এমন কিছু লোক দেখেন যারা গীবত করার অপরাধে নিজেদের নখ দিয়ে নিজেদের মুখ ও বুক আঁচড়াচ্ছিল। আবার এমন কিছু লোক দেখেন যারা মানুষের সম্পদ আত্মসাৎ

করত এবং পরনিন্দায় লিপ্ত ছিল। অনর্থক ওয়াজকারী বা দ্বিমুখী নীতি অবলম্বনকারীদের জিহ্বা আগুনের কাঁচি দিয়ে কাটার দৃশ্যও তিনি বর্ণনা করেছেন। এই চাক্ষুষ অভিজ্ঞতাগুলো কেবল ভয় দেখানোর জন্য ছিল না, বরং এগুলো ছিল উম্মাহর জন্য এক শক্তিশালী সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষা। মি'রাজের এই বার্তা মুসলিম সমাজকে গীবত, মিথ্যাচার এবং অন্যায় থেকে দূরে থাকার জন্য আজও অনুপ্রেরণা জোগায়। পরকালীন জবাবদিহিতার এই জীবন্ত চিত্র নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামতাঁর উম্মতকে সরাসরি বর্ণনা করেছেন যেন তারা সঠিক পথে পরিচালিত হয়।

সিদরাতুল মুনতাহা ও সৃষ্টির রহস্যভেদ

মিরাজের সর্বোচ্চ শিখর ছিল 'সিদরাতুল মুনতাহা' বা সৃষ্টির শেষ সীমানার বৃক্ষ। এটি এমন এক স্থান যেখানে সৃষ্টির সকল জ্ঞানের সমাপ্তি ঘটে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে ফেরেশতা জিবরাঈল (আ.)-কে তাঁর নিজস্ব ও প্রকৃত আকৃতিতে দেখার বিরল সুযোগ পান। জিবরাঈল (আ.)-এর সেই মহিমান্বিত রূপ তাঁর আগে আর কেউ পূর্ণাঙ্গভাবে দেখেননি। সৃষ্টির সকল রহস্য এবং আল্লাহর অসীম নিদর্শনগুলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে উন্মোচিত হয়। সূরা আন-নাজমে এই ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আল্লাহ বলেছেন যে, তাঁর দৃষ্টি বিচ্যুত হয়নি এবং তিনি তাঁর প্রভুর মহান নিদর্শনাবলী দেখেছিলেন। এটি বৈজ্ঞানিকভাবেও আমাদের ভাবিয়ে তোলে যে, এই বিশাল মহাবিশ্বে আমাদের জানার বাইরেও অনেক কিছু বিদ্যমান। মিরাজ সফরের মাধ্যমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামএমন সব জ্ঞান অর্জন করেছিলেন যা কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে অর্জন করা সম্ভব নয়। এটি আধুনিক বিজ্ঞানমনস্কদের জন্য এক বিশাল চিন্তার খোরাক জোগায় যে, মহান আল্লাহর কুদরত মানুষের সীমিত জ্ঞান ও জাগতিক নিয়মের অনেক ঊর্ধ্বে।

মিরাজ ও বিজ্ঞানের সামঞ্জস্য

আধুনিক বিজ্ঞানের উৎকর্ষের এই যুগে মিরাজের ঘটনাটি আর কেবল ধর্মীয় বিশ্বাসের বিষয় হয়ে থাকেনি, বরং এটি বৈজ্ঞানিক কৌতূহলের এক বিশাল খোরাক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৪০০ বছর আগে যখন মানুষ যাতায়াতের জন্য উট বা ঘোড়ার ওপর নির্ভরশীল ছিল, তখন একরাতে মহাকাশ ভ্রমণের দাবি করা ছিল অকল্পনীয়। কিন্তু বর্তমান পদার্থবিজ্ঞানের তত্ত্বগুলো মিরাজের এই অলৌকিকতাকে যৌক্তিকভাবে বুঝতে সাহায্য করে।

প্রথমত, সময়ের আপেক্ষিকতা (Time Dilation): আলবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো বস্তু যদি আলোর গতির কাছাকাছি বেগে ভ্রমণ করে, তবে তার জন্য সময় ধীর হয়ে যায়। মিরাজের বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ভ্রমণ শেষে ফিরে আসেন, তখন তাঁর অজুর পানি গড়াচুড়ি করছিল এবং দরজার শিকল নড়ছিল। এর অর্থ হলো, মহাকাশে তাঁর দীর্ঘ ভ্রমণের সময় পৃথিবীতে সময় কার্যত থমকে ছিল। বিজ্ঞানের ভাষায় এটি 'টাইম ডাইলেশন'-এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ, যা প্রমাণ করে যে উচ্চতর কোনো মাত্রায় সময় আমাদের পার্থিব সময়ের চেয়ে ভিন্নভাবে কাজ করে।

দ্বিতীয়ত, স্থান-কালের বক্রতা ও ওয়ার্মহোল (Wormholes): আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানে 'ওয়ার্মহোল' বা 'শর্টকাট' পথের ধারণা প্রচলিত আছে, যার মাধ্যমে মহাবিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চোখের পলকে পৌঁছে যাওয়া সম্ভব। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর 'বুরাক' নামক সওয়ারির গতি বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, এর প্রতিটি কদম ছিল তার দৃষ্টির শেষ সীমানায়। এটি আধুনিক বিজ্ঞানের 'টেলিপোর্টেশন' বা 'হাইপারস্পেস' ভ্রমণের ধারণার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বস্তুবাদী সংশয় ও রূহানি জগতের বাস্তবতা

বস্তুবাদী দর্শনের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো এটি কেবল দৃশ্যমান ও পরিমাপযোগ্য বস্তুকেই সত্য বলে গ্রহণ করে। কিন্তু ইসলামের আকিদা অনুযায়ী, এই দৃশ্যমান জগতের বাইরেও এক বিশাল 'রূহানি' বা আধ্যাত্মিক জগত বিদ্যমান। বস্তুবাদীরা প্রায়ই মি'রাজকে তাদের যুক্তির দাঁড়িপাল্লায় মাপতে গিয়ে সংশয়ে ভোগেন। তাদের মতে, কোনো মানুষের পক্ষে সশরীরে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ভেদ করে এত দ্রুত আসমানে যাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু তারা ভুলে যান যে, স্রষ্টা যখন কোনো কাজ করেন, তখন তিনি তাঁর সৃষ্ট প্রাকৃতিক নিয়মের (Laws of Nature) মুখাপেক্ষী থাকেন না।

বস্তু দিয়ে রূহ বা আত্মার জগত বোঝা অসম্ভব। রূহ হলো মহান আল্লাহর এক বিশেষ আদেশ, যা সাধারণ পদার্থের নিয়মে চলে না। মিরাজ ছিল মূলত বস্তুর ওপর রূহের বা আধ্যাত্মিক শক্তির বিজয়। আধুনিক বিজ্ঞান এখন স্বীকার করে যে, এই মহাবিশ্বে আমাদের দৃশ্যমান জগতের বাইরেও সমান্তরাল অনেক মাত্রা (Dimensions) থাকতে পারে।

সুতরাং, কেবল ত্রিমাত্রিক (Third Dimensions) জগতের সাধারণ জ্ঞান দিয়ে মিরাজের মতো উচ্চতর মাত্রার ঘটনাকে অস্বীকার করা বুদ্ধিবৃত্তিক সংকীর্ণতা ছাড়া আর কিছু নয়। ঈমানদারের কাছে মিরাজ হলো সেই মহাসত্য, যা প্রমাণ করে যে দুনিয়ার ক্ষুদ্র বস্তু জগতের বাইরেও এক অসীম ও রাজকীয় জগত রয়েছে, যার অধিপতি মহান আল্লাহ স্বয়ং। বস্তুবাদীদের সংশয় কেবল তখনই কাটবে যখন তারা জাগতিক চশমা খুলে বিশ্বাসের আলোয় মহাবিশ্বকে দেখতে শিখবে।

কবি ও সাহিত্যিকদের ভাবনায় মিরাজ

আল মিরাজের ঘটনাবলি বিশ্বসাহিত্যে একটা প্রচন্ড আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। মূলত বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে মিরাজ এক অনন্য অনুপ্রেরণার উ ৎস হিসেবে কাজ করেছে। যুগ যুগ ধরে মহাকবি ও সাহিত্যিকগণ এই মহান যাত্রার আধ্যাত্মিক সৌন্দর্য, রূপক ও রহস্যময়তাকে তাঁদের লেখার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন। মি'রাজ কেবল একটি ধর্মীয় ঘটনা নয়, বরং এটি কবির কল্পনা ও আধ্যাত্মিক সাধনার চূড়ান্ত উচ্চতাকে স্পর্শ করেছে।

মুসলিম সাহিত্যিকদের মধ্যে ফার্সি মহাকবি শেখ সাদী (রহ.) তাঁর অমর কাব্যগ্রন্থ 'গুলিস্তা' ও 'বোস্তা'-তে মিরাজের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছেন। তাঁর বিখ্যাত নাতে রাসূল "বালাগাল উলা বিকামালিহি" মিরাজের সৌন্দর্যেরই এক অনুপম প্রকাশ। মহাকবি আল্লামা ইকবাল তাঁর আধ্যাত্মিক দর্শনে মিরাজকে মানুষের আত্মিক মুক্তির প্রতীক হিসেবে দেখেছেন। তাঁর 'জাভেদনামা' কাব্যে তিনি মিরাজ সফরের আদলে মহাকাশ ও গ্রহ-নক্ষত্র ভ্রমণের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক সত্য অন্বেষণ করেছেন। ইকবাল মনে করতেন, মিরাজ হলো মানুষের ক্ষুদ্র গণ্ডি পেরিয়ে অসীমের সাথে লীন হওয়ার নাম।

বাংলা সাহিত্যেও মিরাজের প্রভাব অপরিসীম। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর অসংখ্য কবিতা ও হামদ-নাতে মিরাজের বর্ণনা দিয়েছেন অত্যন্ত তেজস্বী ও ভক্তিময় ভাষায়। তিনি বুরাকের গতি এবং সিদরাতুল মুনতাহার রহস্যময়তাকে কাব্যে রূপান্তর করে সাধারণ মানুষের কাছে মি'রাজের আধ্যাত্মিক গুরুত্ব পৌঁছে দিয়েছেন। এমনকি পশ্চিমা সাহিত্যেও মি'রাজের প্রভাব খুঁজে পাওয়া যায়। অনেক গবেষক মনে করেন  বিশ্ববিখ্যাত মধ্যযুগীয় কবি দান্তে তাঁর 'ডিভাইন কমেডি' (Divine Comedy) রচনায় মিরাজের সফরের কাঠামো ও দৃশ্যকল্প থেকে পরোক্ষভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। তিনি মহিউদ্দীন ইবন আরাবির রচনা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মহাকাব্য রচনা করেন। মিরাজ কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য সম্পদে পরিণত হয়েছে, যা মানুষকে আজও সুন্দরের ও অসীমের সন্ধান দিয়ে চলেছে।

 শাশ্বত শিক্ষা

আমরা দেখলাম ইসরা ও মিরাজ কেবল একটি অলৌকিক সফর ছিল না, বরঞ্চ এটি ছিল ইসলামের আকিদা ও ইবাদতের এক পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা। এই ঘটনার মাধ্যমে নামাজ নামক শ্রেষ্ঠ উপহারটি মানবজাতি পেয়েছে, যা আজও আমাদের রূহানি শক্তির উৎস। মিরাজ আমাদের শেখায় যে প্রতিকূল অবস্থায় আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা রাখলে তিনি তাঁর রহমতের হাত প্রসারিত করেন।

এটি আমাদের পরকালীন জীবনের বাস্তবতা এবং নৈতিক আচরণের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করে। আধুনিক বিশ্বের বস্তুবাদী সমাজে মিরাজের শিক্ষা আমাদের আধ্যাত্মিকতার দিকে ধাবিত করে এবং স্মরণ করিয়ে দেয় যে আমাদের অস্তিত্ব কেবল এই নশ্বর পৃথিবীর মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। আল্লাহর অসীম ক্ষমতার কাছে আত্মসমর্পণ করে তাঁর বিধানগুলো মেনে চলাই হলো এই মহিমান্বিত ঘটনার প্রকৃত সার্থকতা। মিরাজের শিক্ষা আজও প্রতিটি মুমিনের হৃদয়ে ঈমানের বাতিঘর হিসেবে কাজ করে। এই যাত্রা সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী, বিশ্বাসের কষ্টিপাথর ও মানুষের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহান দয়ার স্মারক।

ড. মহিউদ্দীন মোহাম্মদ:  গবেষক ও  ধ্রুব নিউজের উপদেষ্টা সম্পাদক

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 225 x 270 Position (2)
Position (2)