আল জাজিরা
ছবি: সংগৃহীত
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেট নির্বাচনে কোনো দল বা জোট একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে না। বুথফেরত জরিপের ফল অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোট এবং বিরোধী জোট-কেউই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে দেশটিতে নতুন সরকার গঠন নিয়ে শুরু হতে পারে দীর্ঘ রাজনৈতিক দর-কষাকষি। প্রশ্ন উঠেছে, শেষ পর্যন্ত কে হবেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী?
আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল টুয়েলভের বুথফেরত জরিপ অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট ৫২টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পেতে পারে ৫০টি আসন। আরব লিস্ট পেতে পারে ১৯টি আসন।
ইসরায়েলের নেসেটে মোট আসন ১২০টি। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১টি আসন। বুথফেরত জরিপের হিসাবে কোনো পক্ষই সেই সংখ্যায় পৌঁছাতে পারেনি। ফলে সরকার গঠনে ছোট দলগুলোর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলো কোনো জোটের সঙ্গে যুক্ত হলে তারা সরকার গঠনের ক্ষেত্রে নির্ণায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের আগে সরকার গঠনের সমীকরণ নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল জানা যাবে আগামী ৪ নভেম্বর।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত
চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। তারা কাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান, তা জানতে চাইবেন তিনি। এরপর যার সরকার গঠনের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বলে মনে হবে, তাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন প্রেসিডেন্ট।
এই প্রার্থী যে নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া দলের নেতা হবেন, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। বর্তমান পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহু ও আইজেনকটকে প্রধানমন্ত্রী পদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে দায়িত্ব পাওয়ার পর সরকার গঠনের জন্য মনোনীত প্রার্থী প্রথমে ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজনে প্রেসিডেন্ট আরও ১৪ দিন সময় বাড়াতে পারবেন। এ সময় দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠন, মন্ত্রিসভায় পদ বণ্টন এবং নীতিগত বিষয়ে সমঝোতার চেষ্টা চলবে।
কোনো প্রার্থী ৬১টি আসনের সমর্থন নিশ্চিত করতে না পারলে ছোট দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সংখ্যালঘু সরকার গঠনের চেষ্টা করতে পারেন। আবার প্রধানমন্ত্রী পদ পর্যায়ক্রমে ভাগ করে নেওয়ার মতো সমঝোতাও হতে পারে।
নতুন সরকারকে দায়িত্ব নিতে হলে নেসেটে আস্থা ভোটে জয়ী হতে হবে। কিছু দলের ভোটদানে বিরত থাকার পরিস্থিতিতে ৬১টির কম ভোট পেয়েও কোনো সরকার আস্থা ভোটে জিততে পারে।
সরকার গঠন না হলে কি আবার নির্বাচন
প্রথম মনোনীত প্রার্থী সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে প্রেসিডেন্ট অন্য একজনকে দায়িত্ব দিতে পারেন। দ্বিতীয় প্রার্থীও ব্যর্থ হলে নেসেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা তৃতীয় কোনো প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সরকার গঠনের জন্য তাকে ১৪ দিন সময় দেওয়া হবে।
এরপরও সমাধান না হলে নেসেট ভেঙে দিয়ে নতুন নির্বাচনের পথ তৈরি হতে পারে। নিয়ম অনুযায়ী, সে ক্ষেত্রে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশ পরিচালনা করবে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নেতানিয়াহুই এ সরকারের নেতৃত্বে থাকতে পারেন।
আরব দলগুলোর সমর্থন পেতে হবে যাদের
বুথফেরত জরিপে আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলোর ভালো ফল সরকার গঠনের সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। দলগুলো কোনো জোটের অংশ না হওয়ায় তাদের সমর্থন পেতে নেতানিয়াহু ও বিরোধী শিবির-দুই পক্ষকেই রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ করতে হতে পারে।
বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকট বলেছেন, নেতানিয়াহুর প্রতি মানুষের আস্থার সংকট বুথফেরত জরিপে স্পষ্ট হয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদও নেতানিয়াহুর জোটের ফলকে ‘শোচনীয় পরাজয়’ বলে মন্তব্য করেছেন।
তবে এসব মন্তব্যের সঙ্গে একমত নন নেতানিয়াহুর জোটের নেতারা। ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও লিকুদ পার্টির নেতা গিদিয়ন সার বিরোধীদের বক্তব্যকে আগাম উদ্যাপন বলে মন্তব্য করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, লিকুদ ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল।
বুধবার জেরুজালেমে দলীয় সমর্থকদের উদ্দেশে নেতানিয়াহু বলেন, ‘লিকুদ দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল। আমরা একটি শক্তিশালী নতুন জাতীয় সরকার গড়ব।’
ইসরায়েলে বসবাসরত ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক এহাব জাবারিন বলেন, বুথফেরত জরিপে নেতানিয়াহুর জোটের দুর্বলতা ফুটে উঠেছে। তবে এখনই নেতানিয়াহুর চূড়ান্ত পরাজয় কিংবা তার রাজনৈতিক জীবনের অবসান ঘোষণা করার সময় আসেনি। তার মতে, সরকার গঠনে অচলাবস্থা তৈরি হলে আলোচনা চলাকালে নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকতে পারেন।
ইসরায়েলে অচলাবস্থার পুরোনো ইতিহাস
ইসরায়েলে সরকার গঠন নিয়ে এমন অচলাবস্থা আগেও দেখা গেছে। ২০১৯ সালের এপ্রিল থেকে ২০২০ সালের মার্চের মধ্যে দেশটিতে তিনবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটাতে শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহু ও তার তৎকালীন প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বেনি গান্টজের মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগির চুক্তি হয়।
চুক্তি অনুযায়ী, তাদের পর্যায়ক্রমে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের কথা ছিল। তবে বাজেট পাস করতে ব্যর্থ হওয়ায় এক বছরের মধ্যে সেই জোট সরকার ভেঙে যায়।
এবারও কোনো পক্ষ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় সরকার গঠনে দীর্ঘ আলোচনা ও সমঝোতার প্রয়োজন হতে পারে। শেষ পর্যন্ত কোন দল বা জোট সরকার গঠন করবে, তা নির্ভর করছে চূড়ান্ত ফলাফল এবং পরবর্তী রাজনৈতিক দর-কষাকষির ওপর।