ধ্রুব নিউজ
শিল্পী যোগেন চৌধুরী ছবি: এ আই প্রণীত
সকালটা শুরু হয়েছিল একরকম ভালো লাগা নিয়ে। শান্তিনিকেতনের আমাদের প্রিয় জ্যেষ্ঠ অগ্রজ রাজেশ দাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালাম। মনে পড়ল, আজ তো বিশ্ববিখ্যাত শিল্পী পাবলো পিকাসোরও জন্মতিথি। কিন্তু সেই আলোর আবহের মাঝেই নেমে এলো এক গভীর বিষাদের ছায়া। হঠাৎ খবর পেলাম—আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় শিল্পী, কলাভবনের প্রাক্তন এমিরিটাস অধ্যাপক যোগেন চৌধুরী আর নেই। ক্যান্সারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ের অবসান ঘটিয়ে তিনি পাড়ি দিয়েছেন না ফেরার দেশে (১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৯ – ২৫ অক্টোবর ২০২৬)।
সংবাদটি শোনার পর থেকেই বুকের ভেতর কান্না দলা পাকিয়ে উঠছে। চোখের সামনে কেবল যোগেন দা নন, ভেসে উঠছে কলাভবনের আরেক প্রখ্যাত ছাপচিত্র শিল্পী ও আমাদের শিক্ষক পিনাকী বারুয়ায়ের (পিনাকী দা) মুখটিও। শান্তিনিকেতনে পড়ার সময় একবার কোনো কারণে বাড়ি থেকে খরচের টাকা আসতে দেরি হয়েছিল। আমার বিষণ্ণ চেহারা দেখে পিনাকী দা সেদিন এক অদ্ভুত মমতায় বলেছিলেন, “বিকালে বাড়িতে আসিস, খরচটা নিয়ে যাস।” একজন শিক্ষার্থীর চোখের ভাষা কীভাবে যে শিক্ষকেরা বুঝে ফেলতেন, আজও ভেবে অবাক হই! নিজেকে সত্যিই ভাগ্যবতী মনে হয়, এমন মহান শিল্পীদের স্নেহের ছায়ায় আমাদের বেড়ে ওঠার সুযোগ হয়েছিল।
গতকাল (রবিবার) থেকেই যোগেন দার শিল্পকর্ম, জীবন, প্রামাণ্যচিত্র, কবিতা ও প্রচ্ছদ নিয়ে অনেক লেখা পড়ছিলাম। জীবনের কোনো মুহূর্ত তিনি অপচয় করেননি; সারাক্ষণ আঁকতেন। অনেকে বলেন তাঁর রেখা খুব সহজ, কিন্তু সেই সহজ রেখার অন্তরালে লুকিয়ে আছে ভীষণ জীবনঘনিষ্ঠ গল্প—খুব সাধারণ জীবনযাপনের এক অসাধারণ রূপায়ণ।
২০০০ সালে আব্বা আমাকে শান্তিনিকেতনে ভর্তি করিয়ে দিয়ে এলেন। অবশ্য তার আগেই যশোরের ‘চারুপীঠ’-এ ছবি আঁকার হাতেখড়ি হয়েছিল। আউটডোর, মডেল ড্রয়িং বা স্টিল লাইফ—সবই শিখছিলাম, কিন্তু প্রকৃতির রঙের সূক্ষ্ম পার্থক্য তখনো সেভাবে অনুধাবন করতে পারিনি। বিএফএ দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় আমাদের কাজ দেখতে এলেন কলাভবনের অবসরপ্রাপ্ত এমিরিটাস অধ্যাপক যোগেন চৌধুরী। সমগ্র ভারতে যাঁর নামডাক, তিনি আমার বেশ কিছু জলরঙের কাজ দেখে মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার বাড়ি কি বাংলাদেশে?” আমি কিছুটা অবাক হয়েছিলাম। তখন তিনি বুঝিয়ে বললেন—‘বীরভূমের সবুজ’ আর ‘বাংলার সবুজের’ মধ্যে একটা সূক্ষ্ম তফাত আছে, যা আমার কাজে ফুটে উঠেছে। তারপর জানালেন, ওনার শৈশব কেটেছে বাংলাদেশের ফরিদপুরে। রঙের এই চিরন্তন সত্যটি তিনি একমুহূর্তেই আমার হৃদয়ে গেঁথে দিয়েছিলেন।
অত্যন্ত অমায়িক ও সহজ ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন যোগেন দা। ওনার সঙ্গে কাটানো টুকরো টুকরো স্মৃতিগুলো আজ বড্ড বেশি মনে পড়ছে। একবার সোহেল প্রাণন আর আমি ওনার শান্তিনিকেতনের স্টুডিওতে গেলাম। সোহেল স্কেচ খাতা থেকে ওর কাজ দেখাচ্ছিল, আর আমি বরাবর মুখচোরা স্বভাবের বলে এক কোণে দাঁড়িয়ে পরিপাটি ঘরটি দেখছিলাম।
আরেকটি স্মৃতি বেশ স্পষ্ট। বাংলাদেশের প্রখ্যাত শিল্পী মোখলেসুর রহমান ভাইয়ের একক ছাপচিত্র প্রদর্শনী হবে কলকাতায়। মোখলেস ভাই আমাকে দায়িত্ব দিলেন শান্তিনিকেতন থেকে যোগেন দাকে সঙ্গে করে কলকাতায় নিয়ে যাওয়ার। শান্তিনিকেতন থেকে হাওড়া স্টেশন পর্যন্ত সেই রেলযাত্রাটি ছিল আমার জীবনের এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। যোগেন দা স্টেশন থেকে মজার মজার খাবার কিনে দিচ্ছেন, আর শোনাচ্ছেন ওনার শিল্পীজীবনের নানা গল্প। আমি ছোট ছোট স্কেচ করছিলাম, তিনি কৌতূহল ভরে দেখছিলেন। হাওড়া স্টেশনে পৌঁছানোর পর তিনি নিজেই একটি ট্যাক্সি ডেকে আমাকে কলকাতার চেনা গন্তব্যে—ভাস্কর উমা সিদ্ধার্থের স্টুডিওতে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দিলেন। একজন বিশ্বখ্যাত শিল্পী হয়েও এক নবাগত শিক্ষার্থীর জন্য তাঁর এই অভিভাবকতুল্য স্নেহ ও দায়িত্ববোধ আমাকে চিরঋণী করে রেখেছে।
কলাভবনে পড়ার সময় আমাদের ব্যাচের “প্রতীতি” শিরোনামে কয়েকটি দলীয় প্রদর্শনী হয়েছিল। তেমনই একটি প্রদর্শনীতে আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন শিল্পী যোগেন চৌধুরী, বিশ্বভারতীর তৎকালীন উপাচার্য ড. সুজিত কুমার বসু ও তাঁর সহধর্মিণী, অধ্যাপক নন্দদুলাল মুখার্জী, অধ্যাপক সঞ্চয়ন ঘোষসহ আমাদের বন্ধুরা। সেই যৌথ ছবিগুলো আজ কেবল ফ্রেমবন্দী স্মৃতি নয়, জীবনের এক একটি অমূল্য অর্জন।
আজ সকালে ওনার অফিশিয়াল ওয়েবসাইটটি দেখছিলাম—আঁকা ছবি, কবিতা, প্রচ্ছদ আর আলোকচিত্রের এক বিপুল সম্ভার। বারবার মনে হচ্ছিল, মানুষের জীবন কত সংক্ষিপ্ত, কিন্তু সত্যকারের শিল্পের মহিমা কত বিশাল! কাঁধে ঝোলা ব্যাগ নিয়ে কলাভবনের প্রাঙ্গণে, বিভিন্ন আলোচনা সভায় কিংবা ঢাকায় গ্যালারির প্রদর্শনীতে তাঁর সেই প্রাণবন্ত উপস্থিতি আর দেখা যাবে না।
শিল্পের চিরন্তন রেখায় আর পরম মমতায় তিনি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন চিরকাল। মহীরূহ সম শিল্পী যোগেন চৌধুরীর প্রয়াণে জানাই অন্তরের বিনম্র শ্রদ্ধা।
লেখক: কলাভবন, বিশ্বভারতীর প্রাক্তন শিক্ষার্থী