আন্তর্জাতিক ডেস্ক
নির্বাচনী প্রচারে ৮০ বছর বয়সী লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা ছবি: রয়টার্স
বছরের পর বছর দুর্নীতির কেলেঙ্কারি, ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি এবং জনমত জরিপের নানামুখী সমীকরণকে ভুল প্রমাণিত করে চতুর্থবারের মতো ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন বামপন্থী রাজনীতির প্রভাবশালী আইকন লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। গতকাল দেশটির সর্বোচ্চ নির্বাচনী আদালত ঘোষিত ফলে সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে ও সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারোকে পরাজিত করে এই ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করেন তিনি। বিভিন্ন জরিপ, নির্বাচনী রেকর্ড এবং বিশ্বজুড়ে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে বাড়তে থাকা জনমতের প্রবণতাকে অগ্রাহ্য করে লুলার এই প্রত্যাবর্তন লাতিন অঞ্চলে ডানপন্থীদের একের পর এক নির্বাচনী বিজয়ের ধারায় একটি বড় ধাক্কা দিয়েছে।
প্রথম দফার নির্বাচনে এগিয়ে থাকলেও চূড়ান্ত ধাপে এসে লুলার কাছে ৪০ লাখেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে হেরে যান ফ্লাভিও বলসোনারো। তবে পরাজিত হয়েও ফলাফল মেনে না নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের এক আদেশে শেষ মুহূর্তে ভোট গ্রহণের সময় দুই ঘণ্টা বাড়ানোর অজুহাতে ফল বাতিলের আবেদন করার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। ফ্লাভিওর এই প্রতিক্রিয়া ২০২২ সালে লুলার কাছে হেরে যাওয়ার পর তার বাবার আচরণেরই প্রতিধ্বনি। উল্লেখ্য, সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারো কখনোই নিজের পরাজয় মেনে নেননি এবং পরবর্তীতে ক্ষমতায় টিকে থাকতে সামরিক অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের দায়ে তাকে ২৭ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ফ্লাভিওর পরাজয়ের ব্যবধান তার বাবার চেয়েও দ্বিগুণের বেশি এবং দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বৃষ্টির কারণে ভোট গ্রহণের সময় বাড়ানোর আবেদনে তার নিজস্ব দলও যুক্ত ছিল, ফলে নির্বাচনী ফল বাতিল হওয়ার কোনো বাস্তব সম্ভাবনা নেই। ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান 'রেনে'-র লাতিন আমেরিকা-বিষয়ক বিশ্লেষক মারিও ব্রাগা জানান, আগামী কয়েক দিনে ডানপন্থীদের কিছু বিক্ষোভ দেখা যেতে পারে, তবে তা নির্বাচনী ফলাফল পাল্টে দেয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।
আশি-র দশকে ব্রাজিলে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর লুলাই প্রথম প্রার্থী, যিনি প্রথম দফার ভোটে দ্বিতীয় স্থানে থেকেও চূড়ান্ত দফায় এসে জয় ছিনিয়ে এনেছেন। ৮০ বছর বয়সী সাবেক এই ধাতুশ্রমিক ও ইউনিয়ন নেতা ২০১৮ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দুর্নীতির অভিযোগে কারাবন্দী ছিলেন। পরে তার বিরুদ্ধে দেয়া দণ্ডাদেশ বাতিল করা হলে ২০২২ সালে বলসোনারোকে পরাজিত করে ক্ষমতায় ফেরার পথ তৈরি হয়। এবারও পাঁচ দশকের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় গড়ে ওঠা বাস্তববাদী ও জনতুষ্টিবাদী কৌশলের সমন্বয়ে প্রচারণা চালান তিনি। বিশেষ করে মহামারী ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ফলে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায়, ঐতিহ্যবাহী এই নেতা অ্যাপভিত্তিক অর্থনীতির সাথে খাপ খাওয়াতে কতটুকু সক্ষম হবেন—তা নিয়ে ভোটারদের মনে সংশয় ছিল। তবে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ভোটার উপস্থিতি এবং নতুনত্ব বেছে নেওয়ার চেয়ে লুলার পরিচিত রাজনৈতিক পথের ওপর ভরসা রাখাতেই তার এই জয় সম্ভব হয়েছে।
নির্বাচনী প্রচারে লুলা তার সরকারের সময় বেকারত্ব, নিরক্ষরতা ও আমাজন বন উজাড়ের হার রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনার সাফল্য তুলে ধরেন। পাশাপাশি তিনি শ্রমজীবী ও দরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়নে একের পর এক প্রস্তাব সামনে আনেন। এর মধ্যে ছিল সারা দেশে সপ্তাহান্তে বিনা মূল্যে গণপরিবহন ব্যবহারের সুযোগ প্রদান এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতা ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি করা। এ ছাড়া ব্রাজিলের কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় শ্রম সংস্কার হিসেবে বিবেচিত একটি সাংবিধানিক সংশোধনীর পক্ষেও তিনি অবস্থান নেন, যা কংগ্রেসে ব্যাপক সমর্থনে পাস হয়। প্রচারণাকালে লুলার অভিযোগ ছিল, ফ্লাভিও বলসোনারো ক্ষমতায় এলে সামাজিক সুরক্ষা খাতের ব্যয় কমাবেন এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে ব্রাজিলের সার্বভৌমত্ব তুলে দেবেন। ট্রাম্পের পররাষ্ট্র দপ্তরও বলসোনারো পরিবারকে ক্ষমতায় ফেরাতে তৎপর ছিল। কিন্তু লুলার এই বিজয়ের ফলে লাতিন অঞ্চলে মার্কিন অনুগত ডানপন্থী জোট বিস্তারের সুযোগ হাতছাড়া হলো ট্রাম্প প্রশাসনের। লুলার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেলসো আমোরিমের মতে, লাতিন আমেরিকার শক্তি ও কূটনীতির রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় বামপন্থী এই নেতার ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
তবে বিপুল সাফল্য সত্ত্বে লুলার চতুর্থ মেয়াদটি সবচেয়ে কঠিন হতে চলেছে বলে মনে করছেন রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। কারণ গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর এবারই সবচেয়ে বেশি রক্ষণশীল ও ডানপন্থী সদস্য পেয়েছে ব্রাজিলের সংসদ। বলসোনারোর লিবারেল পার্টি (পিএল) ও তাদের মিত্ররা নিম্নকক্ষে ২৮০টির বেশি আসন এবং সিনেটে সর্বোচ্চ ৫০টি আসন নিয়ন্ত্রণ করায় উভয় কক্ষেই বিরোধীদের শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। ফলে বাজেট পাস ও আইন প্রণয়নে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সংকুচিত হতে পারে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক দিক থেকেও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে; আগামী বছর ব্রাজিলের প্রবৃদ্ধি মাত্র ২.৩ শতাংশে নেমে আসার পূর্বাভাস রয়েছে। উচ্চ সুদহার এবং জিডিপির ৮২ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়া সরকারি ঋণের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের পারিবারিক ঋণ দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় আর্থিক চাপ আরও বাড়ছে। গোল্ডম্যান স্যাকসের মতে, রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক মডেলে বিশ্বাসী হওয়ায় লুলা সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে খুব বেশি আগ্রাসী হতে পারবেন না। এই পরিস্থিতিতে নতুন ডানপন্থী কংগ্রেস ব্যবসাবান্ধব কাঠামোগত সংস্কার ও সরকারি ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিলে তা সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করতে পারে।