সাইফুল ইসলাম
সাধারণ নাগরিকেরা ময়লা ফেলবেন কোথায়? কদিন আগেও যেখানে বিশাল আকারের কন্টেইনার ডাস্টবিন দেখা যেত, সেখানে আজ খালি জায়গা। কোনো সুনির্দিষ্ট ও বিকল্প ব্যবস্থা না করেই একের পর এক ডাস্টবিন তুলে ভোগান্তিতে পড়েছেন যশোর পৌরসভার সাড়ে চার লাখ বাসিন্দা।
কাগজে-কলমে যশোর পৌরসভায় ৪০টি বড় ও ৫০০টি মাঝারি সাইজের কন্টেইনার থাকার কথা বলা হলেও বাস্তবে শহরের কোনো মোড়েই সেগুলোর দেখা মিলছে না। বিভিন্ন সড়কের ওপর থেকে রাতারাতি সরিয়ে ফেলা হচ্ছে ডাস্টবিন। ফলে বর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট স্থান না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। চরম ক্ষোভে অনেকে বাধ্য হয়ে রাতের আঁধারে বাসাবাড়ির বর্জ্য ফেলছেন রাস্তার ধারের খোলা ড্রেনে। ফলে শহরের নালা-নর্দমা ভরাট হয়ে সামান্য বৃষ্টিতেই তীব্র জলাবদ্ধতা ও পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, শহরের বর্জ্য অপসারণ ব্যাহত হওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ এনজিও কর্মী ও পৌরসভার নিজস্ব পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের পুরোনো দ্বন্দ্ব। পৌরসভার বর্জ্য সংগ্রহের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভিন্ন এনজিও এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কাজের সমন্বয়হীনতা ও টানাপোড়েনের খেসারত দিতে হচ্ছে শহরবাসীকে। একদিকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বর্জ্য সংগ্রহের নামে অতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগ, অন্যদিকে সঠিক সময়ে ময়লা না নেওয়ার কারণে বাসাবাড়িতে পচা ময়লার স্তূপ জমছে।
পৌরসভার নথি অনুযায়ী, প্রায় এক লাখ পরিবারের এই শহরে প্রতিদিন গড়ে ৮০ টন বর্জ্য তৈরি হয়। অথচ গৃহস্থালি বর্জ্য ফেলার জন্য আধুনিক পাত্র বা ডাস্টবিন সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ১০ হাজার পরিবারকে। ফলে প্রায় ৯০ হাজার পরিবার সুনির্দিষ্ট বর্জ্য সংগ্রহ কাঠামোর বাইরে রয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে মানুষ বাসাবাড়ি, অলিগলি এবং সড়ক মহাসড়কের পাশে বর্জ্য ফেলছেন। এসব জমে থাকা ময়লা বেওয়ারিশ কুকুর ও গবাদিপশু টেনে-হিঁচড়ে মূল রাস্তায় ছড়িয়ে দিচ্ছে, যা থেকে ছড়াচ্ছে তীব্র দুর্গন্ধ। আবার অনেকে সরাসারি ড্রেনে ফেলছেন ময়লা। এতে ভরছে ড্রেন।
এদিকে ২০১৯ সালে ঝুমঝুমপুরে বর্জ্য শোধনাগার আধুনিক পরিরেশ বান্ধব করা হয়। এ শোধনাগারটিতে দৈনিক ৪০ টন বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করা যায়। কিন্তু বর্তমানে সক্ষমতার চারভাগের একভাগ, অর্থাৎ মাত্র ১০ টন বর্জ্য সেখানে শোধন হচ্ছে। ফলে প্রতিদিনের সংগৃহীত ৮০ টন বর্জ্যের মধ্যে প্রায় ৭০ টনই থেকে যাচ্ছে পুরোপুরি অপরিশোধিত। এই অপরিশোধিত বর্জ্য পরিবেশের ওপর ফেলছে মারাত্মক প্রভাব।
পরিবেশ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. সাইদুর রহমান মোল্লা জানান, পচে যাওয়া বর্জ্য থেকে বিষাক্ত পানি (লিচেট) চুয়ে মাটির নিচে চলে যায় এবং ভূগর্ভস্থ পানি দূষিত করে। এটি দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যশৃঙ্খলে ঢুকে পড়ার পাশাপাশি ডায়রিয়া, চর্মরোগ ও ডেঙ্গুসহ নানা খাদ্য ও মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দেয়। তিনি বর্জ্যের উৎসস্থল থেকেই পচনশীল ও অপচনশীল ময়লা আলাদা করে বৈজ্ঞানিক উপায়ে প্রক্রিয়াজাত করার তাগিদ দেন।
হঠাৎ কন্টেইনার সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে যশোর পৌরসভার পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা জায়েদ হোসেন জানান, শহরের সৌন্দর্য রক্ষা এবং রাস্তার মোড়ে পচা ময়লার গন্ধ বন্ধ করতে কন্টেইনার-নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর বদলে সেন্ট্রাল রোডে দুটি স্থায়ী ডাস্টবিন নির্মাণ করা হয়েছে এবং বিএড কলেজের সামনেও স্থায়ী ডাস্টবিন নির্মাণ করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে ৯টি ওয়ার্ডেই পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব স্থায়ী ডাস্টবিন গড়ে তোলা হবে। এছাড়া অনুমোদিত এনজিওগুলো বাড়ি বাড়ি গিয়ে বর্জ্য সংগ্রহ করবে। অতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।
তবে বিকল্প অবকাঠামো পুরোপুরি প্রস্তুত না করে তড়িঘড়ি ডাস্টবিন সরিয়ে নেওয়ায় পৌর কর্তৃপক্ষের দূরদর্শিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন যশোরের সর্বস্তরের নাগরিকেরা। অতি দ্রুত স্থায়ী ডাস্টবিন স্থাপন ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কাজের সমন্বয় নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।