নিজস্ব প্রতিবেদক
আলিফের মরদেহ ঘিরে স্বজনদের আহাজারি ছবি: ধ্রুব নিউজ
যশোরের শ্যামনগর গ্রামের সরু আলপথ দিয়ে যে ছেলেটি প্রতিদিন প্রজাপতির মতো ডানা মেলে ছুটত, তার নাম আলিফ হোসেন। মাত্র ১২ বছর বয়সের এই কিশোরটির পা যেন মাটিতে পড়ত না। কখনো স্কুলের ব্যাগ কাঁধে, কখনো আবার বাবার সার বীজ হাতে—সবখানেই আলিফ ছিল সমান চটপটে। কিন্তু সোমবারের (২ মার্চ) এক তপ্ত দুপুরে বিদ্যুতের স্পৃষ্টে নেমে এসেছে চিরদিনের স্তব্ধতা।
আলিফ ছিল তার বাবা কৃষক আসির উদ্দিনের প্রধান ভরসা। গ্রামবাসী জানত, আসির মিয়ার কোনো কাজে চিন্তা নেই, কারণ পাশে চটপটে আলিফ আছে। আলিফের চাচাতো ভাই রিয়াজুল ইসলাম শুভ স্মৃতি হাতড়ে বলছিলেন, “ও ছিল আমাদের ঘরের আলো। লেখাপড়ায় যেমন মন ছিল, তেমনি ছিল পরিশ্রমী। সকালে হাসিমুখে বাবার সাথে মাঠে গেল সার দিতে। কে জানত, সেই হাসিমুখটাই আমাদের শেষ দেখা হবে!
দুপুর সাড়ে ১২টা। তপ্ত রোদে মাঠের ধানক্ষেতে পানি সেচ দেওয়া জরুরি হয়ে পড়ে। মাঠের কোণে থাকা বৈদ্যুতিক সেচ পাম্পটি চালু করতে এক দৌড়ে এগিয়ে যায় চটপটে আলিফ। কিন্তু নিয়তি সেখানে এক মরণফাঁদ পেতে রেখেছিল। জরাজীর্ণ তারের লিকেজ বা সুইচের কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি—মুহূর্তের বৈদ্যুতিক ঝটকায় ছিটকে পড়ে ছেলেটি।
ঘটনাস্থলের কাছেই থাকা নানা শাহজাহান আলী নাতিকে পড়ে থাকতে দেখে চিৎকার করে দৌড়ে যান। “গিয়ে দেখি ওর নিথর দেহটা মটরের পাশে পড়ে আছে। হাতের তালুটা পুড়ে কালো হয়ে গেছে। আমরা সবাই মিলে ওকে জাগানোর চেষ্টা করলাম, কিন্তু ও আর সাড়া দিল না,” বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন বৃদ্ধ শাহজাহান।
গ্রামের চিকিৎসক মিলন হোসেন ঘটনাস্থলে এসে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, অসতর্কতা বা তারের সামান্য লিকেজ যে কত বড় সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে, আলিফ তার প্রমাণ। সেচ পাম্পের এই খোলা সংযোগগুলো একেকটা জীবন্ত মরণফাঁদ। এত অল্প বয়সে একটা চনমনে প্রাণ এভাবে ঝরে যাওয়া সত্যিই বুক ফেটে যাওয়ার মতো ঘটনা।
শ্যামনগর মধ্যপাড়া গ্রামে এখন শুধু স্তব্ধতা। যে কিশোরের পদচারণায় মুখর থাকত পাড়া, সেখানে আজ শোকের মাতম। আলিফ হয়তো চলে গেছে, কিন্তু তার এই ‘আকস্মিক’ বিদায় আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেল—একটু অসতর্কতা কীভাবে একটি সাজানো সংসার তছনছ করে দিতে পারে।
বাবার ফসলের মাঠে যে প্রাণবন্ত আলিফ সার দিতে এসেছিল, চঞ্চল সেই ছেলেটি আর কোনোদিন বাবার হাত ধরে মাঠে যাবে না।