অভয়নগর (যশোর) প্রতিনিধি
ছবি: ধ্রুব নিউজ
যশোরের অভয়নগর উপজেলার চলিশিয়া ইউনিয়নের একটি শান্ত জনপদ ছিল বাগদাহ। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এই গ্রামের ললাটে এখন 'মাদকের গ্রাম' হিসেবে এক অভিশপ্ত কলঙ্ক তিলক এঁটে গেছে। গ্রামের বাতাসে এখন ফসলের ঘ্রাণের বদলে বারুদ আর মাদকের কটু গন্ধ। আর এই সর্বনাশা মাদকের নেপথ্য প্রভাব পড়ছে গ্রামের কয়েকশ কন্যার ভাগ্যে। অবস্থা এখন এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে, বাগদাহের নাম শুনলেই পাত্রপক্ষ মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে; গ্রামটিতে পাত্র আসা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা যায়, বাগদাহ এখন মাদকের, বিশেষ করে গাঁজা বিক্রির এক অঘোষিত স্বর্গরাজ্য। গ্রামের প্রায় প্রতিটি পাড়ায়, অলিগলিতে এমনকি প্রকাশ্য দিবালোকে চলে মাদকের রমরমা কেনাবেচা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঝেমধ্যেই অভিযান চালায়, উদ্ধার হয় বস্তা বস্তা গাঁজা। কিন্তু মূল হোতারা রয়ে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। মাদক ব্যবসায়ীরা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে জামিনে বেরিয়ে এসে পুনরায় একই কারবারে লিপ্ত হয়। ফলে গ্রামটি এখন মাদক সম্রাটদের নিরাপদ আস্তানায় পরিণত হয়েছে।
এই ভয়াবহ মাদক পরিস্থিতির সবচেয়ে করুণ শিকার হচ্ছেন বাগদাহের তরুণীরা। সামাজিক এই অবক্ষয় এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, পার্শ্ববর্তী গ্রাম বা বাইরের এলাকার কোনো পরিবার বাগদাহ গ্রামের মেয়েদের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক করতে সরাসরি অনাগ্রহ দেখাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, মেয়ের স্বভাব-চরিত্র বা পড়াশোনা পছন্দ হলেও কেবল 'গ্রামের বদনাম' আর 'মাদকাসক্ত পরিবেশের' ভয়ে বিয়ের কথা আর এগোচ্ছে না। অনেক সময় চূড়ান্ত আলোচনার পর পাত্রপক্ষ যখন জানতে পারে মেয়ের বাড়ি বাগদাহে, তখনই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে।
স্থানীয় এক কলেজ শিক্ষক আক্ষেপ করে বলেন, আমাদের গ্রামের মেয়েরা উচ্চশিক্ষিত ও গুণবতী। কিন্তু তাদের সবচেয়ে বড় অপরাধ—তারা এই মাদকের গ্রামে জন্মেছে। বাইরের মানুষ মনে করে, যে গ্রামের প্রায় প্রতিটি পাড়ায় মাদক বিক্রি হয়, সে গ্রামের পরিবেশ সুস্থ হতে পারে না। ফলে আমাদের শিক্ষিত ও ভদ্র পরিবারের মেয়েরাও আজ ললাটের লিখন মনে করে ঘরে বসে কাঁদছে।
এই পরিস্থিতির প্রতিবাদে সম্প্রতি গ্রামের সর্বস্তরের মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। গত শুক্রবার সকালে অনুষ্ঠিত এক প্রতিবাদ সভায় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, শিক্ষক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এক সুরে কথা বলেছেন। চলিশিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সানা আব্দুল মান্নান বলেন, মাদকের কারণে আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে পড়ছে। আমাদের সম্মান ধূলিসাৎ হচ্ছে। যদি দ্রুত প্রশাসন মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা না নেয়, তবে এই গ্রামের অস্তিত্ব টেকা দায় হবে।
বক্তারা জানান, মাদক ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য এতটাই বেড়েছে যে, সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করতেও এখন রীতিমতো জীবন সংশয়ে ভোগেন। এর ফলে অনেক বাবা-মা তাদের মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন। অনেক পরিবার গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার চিন্তাও করছেন। গ্রামের মানুষ এখন কেবল পুলিশের রুটিনমাফিক অভিযান চায় না, তারা চায় একটি স্থায়ী সমাধান। তারা ফিরে পেতে চায় সেই পুরনো বাগদাহকে, যেখানে তাদের কন্যারা কোনো অপবাদ ছাড়াই নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখতে পারবে।
প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ আর সামাজিক প্রতিরোধই পারে বাগদাহের এই অভিশপ্ত তিলক মুছে দিয়ে মেয়েদের সুন্দর ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দিতে।