মনজিল হোসেন
মনজিল হোসেন ছবি: এ আই প্রণীত
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) রসুল (স.) এর প্রিয় চাচা হযরত আব্বাস ইবেন আব্দুল মুত্তালিবের পুত্র ছিলেন।
মায়ের নাম উম্মুল ফজল লুবাবা বিনতে হারিস, খালা উম্মুল মুমিনীন আম্মাজান হযরত মায়মুনা বিনতে হারিস (রা.), জন্ম-হিজরতের ০৩ বছর পূর্বে-শিবে আবু তালিবে। বলা হয় তিনিই একমাত্র শিশু, রসুল (স.) যাকে জন্মের সাথে সাথে নিজের মুখের লালা মুবারক দিয়ে তাহনিক করে দোয়া করেন, 'আল্লাহুম্মা ফাক্কিহ হু ফিদ্দীন ওয়া আল্লিম হু তা'বিল” অর্থ হে আল্লাহ তাকে দ্বীনের গভীর জ্ঞান এবং ব্যাখ্যা করার তাউফিক দান করুন। আল্লাহর রসুলের (স.) এই দোয়ার প্রতিটি হরফ তার জীবনে বাস্তবায়ন হয়েছিল। রসুল (স.) এর ওফাতের সময় তার বয়স হয়েছিল মাত্র ১৩ বছর। তিনি তাকে খুবই স্নেহ করতেন এবং ভালবাসতেন। তিনিও সবসময় রসুল (স.) এর কাছে কাছে থাকতেন।
ওই সময় আরবে ০৪ জন বিখ্যাত আব্দুল্লাহ ছিলেন।
তাঁরা হলেন- ১. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)
২. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)
৩. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যোবায়ের (রা.) এবং
৪. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.)।
এদের মধ্যে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস সবার সেরা ছিলেন।
তিনি ছিলেন আল হাবর ওয়াল বাহার (জ্ঞান সাগর), রইসুল মুফাসসিরিন, রইসুল মুকাসসিরিনা বিল হাদিস এবং শ্রেষ্ঠতম ফকীহ সাহাবীদের একজন। হযরত উমর (রা.) যখন কোন কঠিন বিষয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বেন্দ্ব পড়ে যেতেন তখন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) কে ডাকতেন এবং ঐ বিষয়েয় সমাধান চাইতেন। অতঃপর তিনি ওই বিষয়েয়র উপরে মতামত দিলে আর কাউকে জিজ্ঞাসা করতেন না। হযরত উমর (রা.) তাকে অত্যন্ত গুররুত্ব দিতেন। জ্ঞানের গভীরতা এবং অতুলনীয় গুণের কারণে কম বয়সী/তরুণ হওয়া সত্ত্বেও প্রবীণ সাহাবীদের মজলিসে তাকে স্থান দিয়েছিলেন। পিতা হযরত আব্বাস (রা.) অত্যান্ত দূরদৃষ্টি সম্পন্ন ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। তিনি তার পুত্রকে উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন-আমি দেখছি উমর তোমাকে তার সভাসদগণের মধ্যে স্থান দিয়েছেন এবং উপদেশ গ্রহণের জন্যে তোমাকে তালাশ করেন। সুতরাং ০৩টি বিষয় মনে রেখো-
১. তিনি যেন তোমাকে কখনও মিথ্যাবাদী হিসাবে না পান,
২. তাঁর সামনে কারো গোপন বিষয় প্রকাশ করবে না,
৩. তাঁর সামনে কারো গীবত করবে না।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) ছিলেন অত্যন্ত নম্র ভদ্র অথচ বীরদীপ্ত প্রোজ্জ্বল চেহারার অকুতোভয় সাহসী একজন অনুসরণীয় ব্যক্তি। দুনিয়ার কোন কালিমা তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। হযরত আলী (রা.) এর খেলাফত কালে তিনি বসরার গভর্নর ছিলেন। হযরত আলী (রা.) এর এক প্রশ্নের জবাবে হযরত সাসা বিন সোহেল তার সম্পর্কে অত্যন্ত উচু মর্যদাপূর্ন মন্তব্য করেন। তিনি বলেন হে আমিরুল মুমিনিন, তিনি (হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস) তিনটি বিষয় গ্রহন করেন এবং তিনটি বিষয় পরিহার করেন।
গ্রহণীয় তিনটি বিষয়
১. তিনি যখন কথা বলেন তখন শ্রোতার হৃদয় কেড়ে নেন,
২. যখন তিনি শ্রোতা হন-তখন মন দিয়ে শ্রবন করেন,
৩. দুটি অসংগতি বা এখতেলাফী বিষয়ের মধ্যে সহজটিকে গ্রহন করেন।
বর্জনীয় তিনটি বিষয়
১. তিনি (অনর্থক) তর্ক করা থেকে বিরত থাকেন,
২. খারাপ লোকের সঙ্গ থেকে দূরে থাকেন,
৩. কেউ তাঁর কাছে ক্ষমা চাইলে-ভৎর্সনা করা থাকা বিরত থাকেন।
রোম সম্রাটের প্রশ্নোত্তর
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর জ্ঞানের গভীরতা ও বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে চমৎকার একটি কাহিনী বর্নিত আছে। রোম সম্রাট একবার কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে মুয়াবিয়া (রা.) কে পত্র লেখেন, প্রশ্নগুলো ছিল-
১. আল্লাহর কাছে সবচেয়ে পছন্দনীয় বাক্য কোনটি?
২. আল্লাহর কাছে সবচেয়ে সম্মানিত বান্দা কে?
৩. আল্লাহর কাছে সবচেয়ে সম্মানিত বান্দী কে?
৪. মায়ের গর্ভ ব্যতিত কোন ৪টি সত্ত্বা প্রানের অস্তিত্ব পেয়েছে?
৫. কোন কবর তার অধিবাসীকে নিয়ে স্থানান্তরিত হয়েছে?
৬. পৃথিবীর কোন স্থানে মাত্র একবার সূর্যের আলো পৌঁছেছে?
৭. রংধনু কী? ৮. আল মাযারাহ কী?
মুয়াবিয়া (রা.) প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতে চেয়ে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) কে চিঠি লিখেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) উত্তরে লিখলেন-
১. আল্লাহর কাছে সবচেয়ে পছন্দনীয় বাক্য হচ্ছে "সুবহানাল্লাহি ওয়াল হামদু লিল্লাহি ওয়ালা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, ওয়ালা হাওলা ওয়ালা কুওয়্যাতা ইল্লাবিল্লাহ,,।
২. আল্লাহর কাছে সবচেয়ে সম্মানিত বান্দা হচ্ছেন হযরত আদম (আ.), কারণ তিনিই তাকে নিজের হাতে সৃষ্টি করে তার অন্তঃকরনে রুহ ফুঁকে দিয়েছেন। ফেরেস্তাদেরকে সেজদাহ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং তাকে পৃথিবীর সকল কিছুর নাম(জ্ঞান) শিক্ষা দিয়েছিলেন।
৩. আল্লাহর কাছে সবচেয়ে সম্মানিত বান্দী হচ্ছেন, ইমরান তনায়া হযরত মরিয়ম (আ.), ঈসা (আ.) এর মাতা।
৪. চার সত্তা যারা মায়ের গর্ভ ছাড়া জন্ম নিয়েছে-হযরত আদম (আ.), হযরত হাওয়া (আ.), হযরত মুসা (আ.) এর লাঠি যা সাপে পরিণত হতো, হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর ভেড়া যা হযরত ইসমাইল (আ.) এর পরিবর্তে জবেহ হয়েছিল। এখানে অনেকে সালেহ (আ.)-এর উটনীর কথা উল্লেখ করেছেন।
৫. ওই কবরটি যা তার অধিবাসীকে নিয়ে চলমান ছিল, তা হচ্ছে হযরত ইউনুছ (আ.)-এর মাছ, যার পেটে তিনি অবস্থান করেছিলেন।
৬. যে স্থানে একবার মাত্র সূর্যের আলো প্রবেশ করেছে, তা হলো (ফেরাউনের কবল থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য) হযরত মুসা (আ.) এর লাঠির আঘাতে সমুদ্রের মাঝখানে রাস্তা হয়ে যাওয়া।
৭. রংধনু হচ্ছে-হযরত নুহ (আ.) এর সময়কার মহাপ্লাবনের পরে আর ওই রকম সর্বব্যপী মহাপ্লাবন না হওয়ার নিশ্চয়তা।
৮. আল মাযারাহ হলো জান্নাতের একটি গেইট বা প্রবেশদ্বার।
উত্তর পেয়ে রোম সম্রাট ভীষণ আপ্লুত হন। তিনি বলেন এই উত্তর মুয়াবিয়ার দ্বারা সম্ভব নয়। নিশ্চয় নবী পরিবারের কারো কাছ থেকে উত্তরগুলো এসেছে।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) ৭১ বছর জীবিত ছিলেন। তিনি ৬৮ হিজরীতে তায়েফে ইন্তিকাল করেন। মায়মুন বিন মিহরান থেকে বর্ণিত, আমি তায়েফে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) এর শেষ জানাজায় অংশগ্রহণ করেছিলাম। তার দেহকে যখন জানাজার জন্য রাখা হলো তখন একটি সাদা রঙ-এর পাখি এসে তার কাফনের ভিতর ঢুকে গেল, সবাই অনেক খোঁজাখুঁজি করেও পাখিটিকে আর পেল না। তারপর যখন জানাযার জন্য দাঁড়ালাম তখন আমরা একটি কণ্ঠস্বর শুনলাম কিন্তু কে এই কণ্ঠের মালিক তা কেউ দেখতে পায়নি। আওয়াজটি ছিল (কুরআনের আয়াত) 'ইয়াআইয়্যাতুহান্নাফসুল মুতমাইন্নাহ ইরযিঈ ইলা- বিকি -দিয়াতাম মারদিইয়াহ, ফাদখুলী ফী ই-বাদদী, ওয়াদখুলী জান্নাতি। (সূরা ফজর ২৭-৩০)।
"হে প্রশান্ত চিত্ত! তুমি তোমার রবের নিকট ফিরে যাও সন্তুষ্ট চিত্তে এবং সন্তুষ্টভাজন হয়ে এবং আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ কর"।
তার ইন্তিকালের পর ইবনে হানাফিয়া বলেন, আজ এ জাতির সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তির ইন্তিকাল হলো।
লেখক: আলেমে দীন ও প্রাবন্ধিক