আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানি রিয়াল ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের নজিরবিহীন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও চলমান যুদ্ধপরিস্থিতির যৌথ আঘাতে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে ইরানের অর্থনীতি। ঐতিহাসিক ধসে দেশটির জাতীয় মুদ্রা রিয়ালের মান নেমে গেছে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। বর্তমানে খোলাবাজারে ১ মার্কিন ডলারের বিপরীতে মিলছে প্রায় ২০ লাখ ২১ হাজার ৯৫০ রিয়াল। আর রেকর্ড এই মুদ্রাস্ফীতির সরাসরি খেসারত দিতে হচ্ছে দেশটির ৯ কোটি ২০ লাখ সাধারণ মানুষকে, যাঁদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা এখন নাভিশ্বাস।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে দেশটির বর্তমান করুণ চিত্র। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধের পর থেকে মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে তেহরানের বাজারে খাদ্য, ওষুধ ও পোশাকসহ প্রায় প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দুই থেকে ছয় গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
পণ্যমূল্যের দৌড় ও সাধারণ মানুষের হাঁসফাঁস
মুদ্রার মান তলানিতে ঠেকায় বাজারে কেনাকাটা করতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়ছেন ক্রেতারা। একসময় ২০ লাখ রিয়াল দিয়ে যেখানে পরিবারগুলোর চার কেজি টমেটো, আধা কেজি মুরগির মাংস ও এক লিটার ভোজ্যতেল হয়ে যেত, এখন সেই টাকায় এর অর্ধেকেরও কম মিলছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে চিকিৎসাসামগ্রীর বাজারে। জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ইনসুলিনের দাম একলাফে ৬৪২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৮৯ লাখ রিয়ালে পৌঁছেছে (যুদ্ধের আগে যা ছিল ১২ লাখ)। এ ছাড়া সাধারণ প্যারাসিটামলের দাম ১৪ লাখ থেকে বেড়ে ২৭ লাখ রিয়াল হয়েছে।
খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রেও ছবিটা একই রকম:
ভোজ্যতেল: ১৭৭% বৃদ্ধি পেয়ে লিটারপ্রতি দাম দাঁড়িয়েছে ৬৮ লাখ রিয়াল।
মুরগির মাংস: ৭৪% বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৭৩ লাখ রিয়ালে।
গরুর মাংস: প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১ কোটি ৭৫ লাখ রিয়ালে (আগে ছিল ১ কোটি ৩৫ লাখ)।
ডিম: প্রতি ডজন ডিমের দাম ২৮ লাখ থেকে লাফিয়ে ৬৪ লাখ রিয়ালে পৌঁছেছে।
ফল ও সবজি: টমেটোর কেজি ১৬ লাখ ১০ হাজার, কমলার কেজি ২৩ লাখ এবং শসার কেজি ১০ লাখ ৫০ হাজার রিয়ালে ঠেকেছে।
শিশুখাদ্য ও অন্যান্য: প্রতি কেজি চাল ৫৪ লাখ, চিনি ১১ লাখ ১৫ হাজার এবং শিশুখাদ্যের কেজি দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৬০ লাখ রিয়ালে। এমনকি একটি সাধারণ শার্ট কিনতে এখন গুণতে হচ্ছে ৮০ লাখ রিয়াল।
দৈনন্দিন হিসাব সহজ করতে ইরানিরা সাধারণত 'তোমান' (১ তোমান = ১০ রিয়াল) একক ব্যবহার করেন। তেহরানের বাসিন্দা আফসানেহ জানান, "আগে স্বামী-স্ত্রী মিলে যে আয় করতাম, তা দিয়ে ৩ থেকে ৬ মাসের সংসার চলত। এখন সেই একই আয় দিয়ে এক মাস চলাই অসম্ভব হয়ে পড়েছে।" এক বছরের সন্তানের মা আফসানেহ জানান, শুধু শিশুর ডে-কেয়ার কেন্দ্রেই প্রতিদিন খরচ হচ্ছে প্রায় ৫০ লাখ রিয়াল (৫ লাখ তোমান)। বাড়তি খরচের চাপে নতুন কাপড় কেনা বা ভবিষ্যতের সব পরিকল্পনা বাতিল করে এখন কেবল মৌলিক চাহিদা মেটাতে লড়াই করছেন তারা।
ব্যবসায় মন্দা ও দেউলিয়া হওয়ার শঙ্কা
দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় ধস নেমেছে খুচরা ব্যবসায়। তেহরানের এক পোশাক ব্যবসায়ী জানান, গত বছরের তুলনায় তাঁর দোকানে বিক্রি কমেছে ৪০ শতাংশের বেশি। কাঁচামাল, পরিবহন ও শ্রমিকের মজুরি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ায় অনেক ব্যবসায়ী এখন শীতের আগেই দোকান বন্ধ করে দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। বর্তমানে লোকসান সামলাতে অনেক দোকানদার গরমের পোশাক কম দামে ছেড়ে দিচ্ছেন।
উপকূলীয় এলাকার পরিস্থিতিও আলাদা নয়। দক্ষিণ ইরানের হরমোজগান প্রদেশের বাসিন্দা সালামা জানান, আগে যে সপ্তাহের বাজার করতে ৫ লাখ তোমান লাগত, এখন সেখানে ৫০ লাখ তোমানও কুলোচ্ছে না। চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া কিংবা সাধারণ সর্দি-কাশির ওষুধ কেনাও এখন সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে।
আয় ও ব্যয়ের আকাশচুম্বী ফারাক
ইরানি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বর্তমানে দেশের সর্বনিম্ন সরকারি মজুরি নির্ধারিত রয়েছে ১৬ কোটি ৬০ লাখ রিয়াল (প্রায় ৮২ ডলার)। অন্যান্য ভাতা মিলিয়ে একজন শ্রমিকের সর্বোচ্চ আয় দাঁড়ায় প্রায় ২২ কোটি রিয়াল বা ১০৮ ডলার।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতির গতি এতই বেপরোয়া যে মাসের শুরুতে প্রাপ্ত বেতনের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা মাস শেষ হওয়ার আগেই অর্ধেকের নিচে নেমে যায়। দীর্ঘদিনের ভূ-রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, উৎপাদনে স্থবিরতা, হরমুজ প্রণালীতে নৌ-অবরোধ এবং বেকারত্বের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে দেশটির অর্থনীতি এখন গভীর সংকটে। যুদ্ধ এই সংকটকে কেবল ত্বরান্বিতই করেনি, বরং কোটি কোটি ইরানির দৈনন্দিন জীবনকে করে তুলেছে দুর্বিসহ।