আন্তর্জাতিক ডেস্ক
শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুল রহমান বিন জসিম আল থানি ছবি: রয়টার্স
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার তীব্র সামরিক ও অর্থনৈতিক উত্তেজনার মাঝে এবার নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। দুই দেশের সম্পর্কে বরফ গলাতে এবং সম্ভাব্য একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে বৃহস্পতিবার তেহরানে পৌঁছাচ্ছেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুল রহমান বিন জসিম আল থানি। ইরানের সাথে বাণিজ্য রাখা আন্তর্জাতিক অংশীদারদের ওপর মার্কিন প্রশাসনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণার পর যখন দু'পক্ষের বাকযুদ্ধ তুঙ্গে, ঠিক তখনই দোহার এই হাই-প্রোফাইল কূটনৈতিক উদ্যোগ সামনে এলো।
উপসাগরীয় অঞ্চলের পরাশক্তি কাতার বরাবরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার জটিল ও স্পর্শকাতর বিষয়ে পর্দার আড়ালে প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে আসছে। বিশেষ করে গত জুনে দুই দেশের সরাসরি সংঘাত যখন চরমে পৌঁছায়, তখন দোহাই কার্যকর ভূমিকা রেখে সাময়িক যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করেছিল।
সংঘাত ষষ্ঠ মাসে পা দিলেও স্থায়ী কোনো শান্তিচুক্তির লক্ষণ এখনো দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। বিশেষ করে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ ‘হরমুজ প্রণালী’র পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে—এ নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরান কেউ কাউকে এক চুল ছাড় দিতে নারাজ। বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের প্রধান এই করিডোরটিকে দরকষাকষির মূল হাতিয়ার বানিয়েছে ইরান।
ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী কৌশলগত এই সরু জলপথ দিয়ে সংঘাতের পূর্বেও বিশ্বব্যাপী মোট উৎপাদিত তেলের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ (দৈনিক ২ কোটি ব্যারেল) পরিবাহিত হতো। কিন্তু সার্বিক পরিস্থিতিতে জাহাজ চলাচলের সাম্প্রতিক চিত্রে দেখা গেছে চরম ধস। বিশ্ব বাণিজ্য পর্যবেক্ষক সংস্থার তথ্য মতে, হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহন গত তিন মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে ঠেকেছে। গত সোমবার এ পথে প্রতিদিন মাত্র ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়েছে, যা স্বাভাবিক সময়ের চার ভাগের এক ভাগ মাত্র।
এদিকে বুধবার ইরানের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী রেভোলিউশনারি গার্ডস (আইআরজিসি) দাবি করে, হরমুজ প্রণালীর সার্বিক ব্যবস্থাপনা এবং এ পথ থেকে অর্জিত রাজস্ব ভাগাভাগি নিয়ে ওমানের সাথে তাদের নীতিগত ঐক্যমত হয়েছে। তবে এ বিষয়ে তেহরানের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ভিন্ন বার্তা দিয়ে জানান, ওমানের সাথে চুক্তির বিভিন্ন ধারা ও শর্ত নিয়ে তাদের মধ্যে আলোচনা এখনো চলমান এবং কোনো চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি।
যুদ্ধের শুরুতে ব্যাপক বিমান হামলায় ইরানের মূল সামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, দেশটির দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং ক্ষিপ্রগতির ড্রোন বহর এখনও বেশ সুরক্ষিত। বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে এমন দেশগুলোতে আঘাত হানা কিংবা হরমুজে বাণিজ্যিক তেলের ট্যাংকার অবরুদ্ধ করে বিশ্ববাজারে চাপ তৈরি করার মতো যথেষ্ট সক্ষমতা তেহরানের এখনো রয়েছে।
এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক সংঘাতের পথ ছেড়ে কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ কৌশলের দিকে জোর দিচ্ছে। ওয়াশিংটনের মূল পরিকল্পনা হলো—ইরানের সাথে যেকোনো ধরণের বাণিজ্যিক লেনদেন বজায় রাখা দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ওপর চড়া নিষেধাজ্ঞা দিয়ে তেহরানকে বিশ্ব অর্থনীতি থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলা।
হরমুজ প্রণালীতে দীর্ঘমেয়াদী এই সংকটের চড়া মাশুল গুনতে হচ্ছে সমুদ্রগামী বাণিজ্য ও সাধারণ নাবিকদের। জাতিসংঘের ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে হরমুজ প্রণালী ও এর আশেপাশের অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বা বাধার অন্তত ৭০টি ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় এ পর্যন্ত অন্তত ১৯ জন সাধারণ নাবিক প্রাণ হারিয়েছেন, যা আন্তর্জাতিক নৌপথে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে।