ধ্রুব ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যের ৫টি দেশ, যারা ইরানে হামলায় ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে তাদেরকে এ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, বলেছেন জাতিসংঘে তেহরানের দূত।
তেহরান সংঘাত অবসানে বিভিন্ন দেশ যখন মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তখন দৃঢ়চেতা ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় সৃষ্ট ধ্বংসযজ্ঞের জন্য যথাযথ ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে।
জাতিসংঘে তেহরানের দূত মঙ্গলবার বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের ৫টি দেশ, যারা ইরানে হামলায় ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে তাদেরকে এ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
হরমুজ প্রণালিতে শুল্ক বসানোর মাধ্যমেও এ ক্ষতিপূরণ আদায় করা যেতে পারে, ইরান এ বিষয়টিও সামনে এনেছে বলে জানিয়েছে আল জাজিরা।
যুদ্ধের আগে বিশ্বের তেল-গ্যাসের ২০ শতাংশই ইরানলাগোয়া এ প্রণালি দিয়ে গন্তব্যে যেত।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা শুরু হওয়ার পর ইরানের প্রত্যক্ষ-অপ্রত্যক্ষ প্রায় ২৭ হাজার কোটি ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে প্রাথমিক এক মূল্যায়নে ইঙ্গিত মিলেছে, রুশ বার্তা সংস্থা রিয়া নভোস্তিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমনটাই বলেছেন ইরান সরকারের মুখপাত্র ফাতেমা মোহাজেরানি।
সাক্ষাৎকারটি মঙ্গলবার প্রকাশিত হয়।
কোন খাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কেমন, তার বিস্তারিত জানাননি ফাতেমা। তবে বলেছেন, পাকিস্তানে চলতি সপ্তাহে হওয়া তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে আলোচনায় ক্ষতিপূরণের প্রসঙ্গটি উত্থাপিত হয়েছিল এবং সামনে যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে যে কোনো সম্ভাব্য বৈঠকেও প্রসঙ্গটি থাকবে।
পাঁচ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম কারখানা, পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনা, তেল ও গ্যাস ক্ষেত্র এবং নানান সংবেদনশীল স্থাপনা নিয়মিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার শিকার হয়েছে। এগুলো মেরামতে কয়েক বছর পর্যন্ত লেগে যেতে পারে।
দেশটির অসংখ্য সেতু, বন্দর, রেললাইন, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা কেন্দ্র, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে; ধ্বংস হয়েছে বিপুল সংখ্যক হাসপতাল, স্কুল, বেসামরিক বাড়িঘরও।
ক্ষয়ক্ষতি পরিমাণের কাজ এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি বলে জানিয়েছে শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির সরকার।
‘অর্থনৈতিক বাস্তবতা’
দিনকয়েক আগে ইরানি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমকে মুখপাত্র ফাতেমা বলেন, ‘বিদ্যমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার’ কারণে সরকারের কাছে এখন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়িঘরের মালিকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সম্পদ নেই।
এদিকে ইরানি এয়ারলাইনস অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক মাকসুদ আসাদি সামানি ইরানি গণমাধ্যমকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামরায় তাদের ২০টি বেসামরিক উড়োজাহাজ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে ৬০টি উড়োজাহাজ ব্যবহারের অনুপযোগী হয়েছে।
এখন ১৬০টির মতো যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ আছে, যেগুলোর বেশিরভাগই কয়েক দশকের পুরনো এবং সেগুলো আকাশে ওড়াতে ব্যাপক রক্ষণাবেক্ষণ কাজের দরকার হয়। কিন্তু মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম না মেলায় ওই রক্ষণাবেক্ষণও কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে, বলেছেন এ কর্মকর্তা।
সামানি জানান, ইরানি এয়ারলাইনগুলো মার্চের শেষ দিকে হওয়া নওরোজ বা পারসি নববর্ষের দিকে তাকিয়ে ছিল। সাধারণত এই সময়েই তাদের ব্যাপক আয় হয়। কিন্তু ৪০ দিনের যুদ্ধ সে সম্ভাবনাও নিঃশেষ করে দিয়েছে। এ যুদ্ধে তাদের মোট ক্ষতির পরিমাণ ৩০০ ট্রিলিয়ান রিয়াল (প্রায় ১৯ কোটি ডলার) বলে তিনি জানান।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের একের পর এক হামলায় তেহরান, তাবরিজ, উরমিয়া ও খুররামাবাদসহ ইরানের একাধিক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে, কন্ট্রোল টাওয়ার ও হ্যাঙ্গারেরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
এতসব ক্ষয়ক্ষতি, সঙ্গে সোমবার থেকে ইরানি বন্দরগুলোকে লক্ষ্য করে শুরু হওয়া মার্কিন নৌ অবরোধের পরও ওয়াশিংটনের সঙ্গে সামনে সম্ভাব্য যে কোনো আলোচনায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণসহ কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েই বড় ছাড় দেওয়া হবে না বলে ইরানি শাসকরা আভাস দিয়েছেন।
কট্টরপন্থি অধ্যুষিত দেশটির পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ক কমিশনের মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজায়ি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বলেছেন, ঘোষিত দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আর বাড়ানো উচিত হবে না। কেননা তা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে তাদের অস্ত্রভাণ্ডার পূরণ ও নতুন হামলার সুযোগ করে দেবে।
“তাদের হয় হরমুজের ওপর নিয়ন্ত্রণসহ ইরানের সব অধিকারের স্বীকৃতি দিতে হবে, নাহলে যুদ্ধে ফিরতে হবে,” লিখেছেন তিনি।
ইরান ২০২৪ সালে তাদের সামরিক খাতে প্রায় ৮০০ কোটি ডলার খরচ করে বলে জানিয়েছে থিঙ্কট্যাংক স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইপিআর)। ওই বছরের অক্টোবরে ইসরায়েলের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির কর্মকর্তা এই ব্যয় তিনগুণ বাড়ানোর অঙ্গীকার করেছিলেন।
তবে স্থানীয় পর্যায়ে ‘অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি’ এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার করণে দেশটির সরকার বছরের পর বছর ধরে বাজেট সঙ্কটে ভুগছে, বলছে আল জাজিরা।
ধ্রুব/এস.আই