Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
সোমবার, ২ মার্চ ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

আয়াতুল্লাহ খামেনি, কীভাবে হয়ে ওঠেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা

আলজাজিরা আলজাজিরা
প্রকাশ : রবিবার, ১ মার্চ,২০২৬, ০২:০০ পিএম
আয়াতুল্লাহ খামেনি, কীভাবে হয়ে ওঠেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা

আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ছবি: সংগৃহীত

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বলতে কেবল একজন ধর্মীয় নেতার কথা বলা হয়—এমন ধারণা অনেকের মধ্যেই রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা শুধু ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব নন, তিনি রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। তিনি সরকারপ্রধান নন ঠিকই, কিন্তু কার্যত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ, সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক, দেশের অর্থনীতি ও নীতিনির্ধারণের প্রধান দিকনির্দেশক এবং রাষ্ট্রপ্রধানের মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি। সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ওপর তার চূড়ান্ত কর্তৃত্ব রয়েছে। শুধু তাই নয়, তিনি বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের নেতা হিসেবেও বিবেচিত হন।

মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে ইরান সরকার। রোববার সকালে ইরানের রাষ্ট্র্রীয় সংবাদমাধ্যমে এ খবর প্রচার করা হয়।

১৯৩৯ সালে ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শিয়া নগরী মাশহাদে জন্মগ্রহণ করেন আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। তিনি ছিলেন খ্যাতিমান মুসলিম ধর্মীয় নেতার সন্তান। তাঁর পরিবার জাতিগতভাবে আজারবাইজানি। প্রতিবেশী ইরাক থেকে তাদের পূর্বপুরুষেরা ইরানে এসে বসতি স্থাপন করেন। প্রথমে তারা উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের তাবরিজে বসবাস শুরু করেন, পরে ধর্মীয় তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত মাশহাদে চলে যান। সেখানে খামেনির বাবা একটি আজারবাইজানি মসজিদের ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

খামেনির মা খাদিজেহ মিরদামাদি ছিলেন কোরআন ও বইপাঠে আগ্রহী। তিনি ছেলের মধ্যে সাহিত্য ও কবিতার প্রতি ভালোবাসা জাগিয়ে তোলেন। পরবর্তী সময়ে পাহলভি শাসনবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার সময়ও তিনি ছেলেকে সমর্থন দেন।

মাত্র চার বছর বয়সে খামেনি কোরআন শিক্ষার মাধ্যমে পড়াশোনা শুরু করেন। মাশহাদের প্রথম ইসলামি স্কুলে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। উচ্চবিদ্যালয় শেষ না করেই তিনি ধর্মতাত্ত্বিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হন এবং সে সময়ের খ্যাতিমান আলেমদের কাছ থেকে শিক্ষা নেন—যাদের মধ্যে ছিলেন তাঁর বাবা এবং শেখ হাশেম গাজভিনি। পরবর্তী সময়ে তিনি শিয়া উচ্চশিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র নাজাফ ও কুমে পড়াশোনা চালিয়ে যান।

কুমে অধ্যয়নকালে তিনি বেশ কয়েকজন প্রখ্যাত আলেমের সান্নিধ্যে আসেন। তাদের মধ্যে ছিলেন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি, যিনি শাহবিরোধী অবস্থানের কারণে তরুণ ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের কাছে বিশেষভাবে জনপ্রিয় ছিলেন।

খামেনি নিজেও ফিকহ (ইসলামি আইনশাস্ত্র) ও তাফসির বিষয়ে পাঠদান শুরু করেন। এর মাধ্যমে বিশেষ করে রাজতন্ত্রে হতাশ তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে তিনি প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হন।

সে সময় ১৯৫৩ সালে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৬ ও মার্কিন সিআইএ-সমর্থিত অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। তিনি ইরানের তেল শিল্প জাতীয়করণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ওই অভ্যুত্থানের পর পাহলভি রাজতন্ত্র পুনরায় পূর্ণ ক্ষমতায় ফিরে আসে।

রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে খামেনিকে একাধিকবার শাহের গোপন পুলিশ সাভাক গ্রেপ্তার করে। তাকে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের দুর্গম শহর ইরানশাহরে নির্বাসনেও পাঠানো হয়। তবে ১৯৭৮ সালের গণবিক্ষোভে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন, যা শেষ পর্যন্ত পাহলভি শাসনের পতন ডেকে আনে।

রাজতন্ত্র উৎখাত হওয়ার পর খামেনি নতুন ইরান প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। ১৯৮০ সালে তিনি স্বল্প সময়ের জন্য প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধ শুরুর পর ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব নেন। জোরালো ও আগ্রাসী বক্তা হিসেবে পরিচিত খামেনি তেহরানের জুমার নামাজের খতিবের প্রভাবশালী পদও লাভ করেন।

১৯৮১ সালে মোজাহেদিন-ই-খালক (এমইকে) নামের একটি বিরোধী গোষ্ঠীর হামলা থেকে অল্পের জন্য প্রাণে বাঁচলেও তিনি তার ডান হাতের কার্যক্ষমতা হারান। খোমেনির সঙ্গে মতপার্থক্যের জেরে সদ্য প্রতিষ্ঠিত ইরানের ধর্মতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করেছিল সংগঠনটি। একই বছর খামেনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং ইরানের প্রথম ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের মধ্য থেকে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন।

১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহোল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন খামেনি। খোমেনি ছিলেন ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের মূল আদর্শিক নেতা, যার নেতৃত্বে পাহলভি রাজতন্ত্রের পতন ঘটে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে ইরানের সামরিক ও আধাসামরিক কাঠামো গড়ে তোলা এবং তা শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা রাখেন খামেনি। এই কাঠামো একদিকে যেমন দেশের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করেছে, অন্যদিকে তেমনি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের প্রভাব বিস্তারে সহায়ক হয়েছে।

বিশ্বের অন্য অনেক দেশের তুলনায় ইরানের শাসন পদ্ধতি বেশ আলাদা। সেখানে নির্বাচনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট বা সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত হলেও দেশের মূল ক্ষমতা রয়েছে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার হাতে।

তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি।

সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি দেশটির সামরিক বাহিনীর কমান্ডার-ইন-চীফ ছিলেন। এছাড়া দেশের সব বড় বা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তার সম্মতি দরকার হয়।

এমনকি ইরান পারমাণবিক ক্ষমতার অধিকারী হবে কিনা অথবা জাতিসংঘের আণবিক শক্তি সংস্থাকে সহযোগিতা করবে কিনা, এসবের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তেও তার মতামত দরকার হয়।

সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার আগে ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী ওই যুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলোর সমর্থন পায় ইরাকের নেতা সাদ্দাম হোসেন। এতে অনেক ইরানির মধ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি তৈরি হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, সেই অভিজ্ঞতাই খামেনির মনে পশ্চিমা বিশ্ব—বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি গভীর অবিশ্বাসের জন্ম দেয়। পরবর্তী কয়েক দশক তার শাসনামলে এই মনোভাবই নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। এর ফলে ইরানকে বহিঃশত্রু ও অভ্যন্তরীণ হুমকির বিরুদ্ধে সর্বদা প্রস্তুত ও প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে থাকার ধারণা রাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে স্থান পায়।

তার নেতৃত্বে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) সময়ের সঙ্গে একটি সাধারণ প্যারামিলিটারি বাহিনী থেকে রূপ নেয় শক্তিশালী নিরাপত্তা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে। তার নেতৃত্বে আইআরজিসি শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় নয়, বরং গোটা অঞ্চলে ইরানের প্রভাব বিস্তারের কেন্দ্রীয় শক্তিতে পরিণত হয়।

তিনি পশ্চিমাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার ব্যাপারে বরাবরই সংশয়ী ছিলেন এবং সমালোচকদের প্রতি কঠোর অবস্থান নেন। সমালোচকদের দাবি ছিল, প্রতিরক্ষা খাতে অতিরিক্ত মনোযোগ দেওয়ার ফলে প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্কার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

তবে তার শাসনামল একাধিকবার বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। ২০০৯ সালে বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে রাস্তায় নামা বিক্ষোভকারীদের কঠোর দমন-পীড়নের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। ২০২২ সালেও নারীর অধিকার ইস্যুতে দেশজুড়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে, যা সরকার কঠোর হাতে দমন করে।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আসে চলতি বছরের জানুয়ারিতে। অর্থনৈতিক দুর্দশা থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দ্রুত দেশব্যাপী অস্থিরতায় রূপ নেয়। অনেক বিক্ষোভকারী সরাসরি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতনের দাবি তোলেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় কর্তৃপক্ষের কঠোর পদক্ষেপ ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর অন্যতম সহিংস সংঘর্ষের জন্ম দেয়।

সমালোচকদের মতে, তরুণ প্রজন্ম যখন সংস্কার ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, তখন খামেনি তাদের প্রত্যাশা থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী বৈরিতা এবং আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার নীতির কারণে সাধারণ জনগণকে উচ্চমূল্য দিতে হয়েছে বলেও তারা মনে করেন।

 

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)