যশোর মা ও শিশু কল্যাণকেন্দ্র। ছবি: ধ্রুব নিউজ
রুগীহীন শয্যা, ওষুধহীন ফার্মেসি, ধুঁকছে যশোর মা ও শিশু কল্যাণকেন্দ্র
সাজানো-গোছানো শয্যা, ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার রাখা হয়েছে চারপাশ; কিন্তু ওয়ার্ডগুলো জুড়ে এক ভুতুড়ে নীরবতা—কোনো রোগীর দেখা নেই। এ চিত্র যশোর মা ও শিশু কল্যাণকেন্দ্রের। প্রসূতি মা ও শিশুদের চিকিৎসায় আধুনিক সব যন্ত্রপাতি থাকলেও অ্যানেস্থেশিয়া চিকিৎসক আর গাইনি বিশেষজ্ঞের অভাবে গত ৫ বছর ধরে এখানে বন্ধ রয়েছে সব ধরনের সিজারিয়ান অপারেশন। এমনকি সরকারি এই হাসপাতালের ফার্মেসিতে চার-পাঁচ মাস আগের কিছু প্যারাসিটামল ছাড়া আর কোনো ওষুধই অবশিষ্ট নেই। ফলে প্রতিদিন বহির্বিভাগে আসা ১০০ থেকে ১৫০ জন গর্ভবতী নারী ও শিশুকে শুধু প্রেসক্রিপশন হাতে নিয়েই হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে।

শত কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি আর বিশাল অবকাঠামো থাকার পরও শুধু চরম সমন্বয়হীনতা আর তীব্র জনবল সংকটে এভাবেই মুখ থুবড়ে পড়েছে ২০ শয্যার ঐতিহ্যবাহী ‘যশোর মা ও শিশু কল্যাণকেন্দ্র’। পাকিস্তান আমলে যশোর শহরের বুকে ৭২ শতক মূল্যবান জমির ওপর এই বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতালটি স্থাপন করা হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে প্রসূতি মা ও শিশুদের জরুরি ও বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে যে গৌরবময় যাত্রা শুরু হয়েছিল, তার সুফল থেকে এখন পুরোপুরি বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয় গরিব ও মধ্যবিত্ত মানুষ।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালাতে কমপক্ষে ৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রয়োজন হলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৭ জন। পুরো হাসপাতাল সামলাচ্ছেন মাত্র একজন মেডিকেল অফিসার। তার সাথে রয়েছেন একজন ফিমেল অ্যাসিস্ট্যান্ট, একজন সরকারি নার্সিং অ্যাটেনডেন্স, একজন এফডব্লিউভি, একজন এমএলএসএস, একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও একজন ড্রাইভার।
অস্ত্রোপচার বন্ধ থাকায় হাসপাতালটিতে অভ্যন্তরীণ রোগীর সংখ্যা শূন্যের কোঠায় নেমেছে। বর্তমানে মাসে ২০ থেকে ২৫টি সাধারণ প্রসব বা নরমাল ডেলিভারি কোনোমতে সম্পন্ন হলেও, সিজারের সামান্যতম প্রয়োজন হওয়া মাত্রই রোগীদের স্থানান্তর করা হয় যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে।
সেবা নিতে আসা নাজমা বেগম নামের এক প্রসূতি নারী তার ক্ষোভ ও আশঙ্কার কথা জানিয়ে বলেন, এখানে নরমাল ডেলিভারি হলেও মনে সারাক্ষণ ভয় কাজ করছিল। শেষ মুহূর্তে যদি সিজারের প্রয়োজন হতো, তবে কী হতো? এখানে সিজারের সার্বক্ষণিক সুবিধা থাকলে আমাদের মতো গরিব পরিবারের অনেক আর্থিক সাশ্রয় হতো।
হাসপাতালের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে সেবিকা শিরিনা খাতুন বলেন, রোগীরা নিয়মিত চেকআপে এলেই সবার আগে জানতে চায় শেষ মুহূর্তে কোনো জটিলতা হলে সিজার করার ব্যবস্থা আছে কি না। সিজার বন্ধ থাকায় তখন আমাদের রোগীদের আশ্বস্ত করার মতো কিছুই বলার থাকে না। অন্যদিকে চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি হাসপাতালটিতে ওষুধের তীব্র সংকট নিয়ে ফার্মাসিস্ট আছিয়া খাতুন জানান, কয়েক মাস আগের কিছু প্যারাসিটামল আর স্যালবুটামল ছাড়া বর্তমানে ফার্মেসিতে আর কোনো ওষুধ নেই।
যশোর মা ও শিশু কল্যাণকেন্দ্রের মেডিকেল অফিসার ডা. সাদিয়া রহমান হাসপাতালের এই স্থবিরতার কথা স্বীকার করে বলেন, অ্যানেস্থেশিয়া চিকিৎসকের শূন্য পদটি দ্রুত পূরণের জন্য আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার লিখিতভাবে অবহিত করেছি। সেখান থেকে আমাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে। আশা করছি খুব দ্রুতই এই সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে এবং ঐতিহ্যবাহী হাসপাতালটি আবার তার পুরোনো প্রাণ ফিরে পাবে।