❒ শিশু মৃত্যু নিয়ে যশোর হাসপাতালে তোলপাড়
নিজস্ব প্রতিবেদক
ছবি: প্রতীকী
ডাক্তারের কোনো পরামর্শ বা অনুমতি ছাড়াই ১০ মাস বয়সী এক শিশুর নাকের অক্সিজেন মাস্ক খুলে দিয়েছেন হাসপাতালের আয়া। মাত্র ১০০ টাকা বকশিশ না পেয়ে ক্ষোভের বশে আয়ার করা এই নিষ্ঠুর আচরণের পর হাসপাতালের সিঁড়িতেই ছটফট করতে করতে মারা গেছে শিশু নাজমা খাতুন। রোববার সন্ধ্যায় যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে এই মর্মান্তিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়। নিহত নাজমা খাতুন যশোর শহরের শংকরপুর এলাকার নূর ইসলামের কন্যা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ঠাণ্ডা ও জ্বরজনিত রোগে নিজ বাড়িতে অসুস্থ হয়ে পড়লে গত ২৭ মে শিশু নাজমা খাতুনকে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর থেকে সে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ছিল। রোববার শিশুটির অবস্থার অবনতি ঘটলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনায় রেফার্ড (স্থানান্তর) করেন।
হাসপাতালে কর্তব্যরত পুলিশ জানায়, এদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে স্বজনরা শিশুটিকে অ্যাম্বুলেন্সযোগে খুলনায় নেওয়ার জন্য নিচে নামানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ওই সময় হাসপাতালের ৪র্থ তলার শিশু ওয়ার্ডের পরিচ্ছন্নতাকর্মী (আয়া) ও যশোর ঘোপ নোয়াপাড়া রোড এলাকার আব্দুল বারেক শেখের স্ত্রী মোছা. নাজমা বেগম (৫৫) ট্রলিতে করে রোগী নিচে নামানোর জন্য স্বজনদের কাছে ১০০ টাকা দাবি করেন। স্বজনরা তাৎক্ষণিকভাবে টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে আয়া নাজমা বেগমের মনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে ডাক্তারের কোনো পরামর্শ ছাড়াই সম্পূর্ণ নিজ দায়িত্বে তিনি শিশুটির নাকে থাকা বিশেষ অক্সিজেন লাইনটি খুলে দেন এবং তার বদলে বড়দের ব্যবহারের একটি সাধারণ অক্সিজেন মাস্ক মুখে চেপে ধরেন।
এতে শিশুটির শরীরে অক্সিজেন সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। স্বজনরা তড়িঘড়ি করে শিশুটিকে নিচে নামিয়ে অ্যাম্বুলেন্সের কাছে নেওয়ার পর বুঝতে পারেন শিশু নাজমা খাতুন আর বেঁচে নেই। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে পুনরায় হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. মো. মাসুম রেজা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ডাক্তারের অনুমতি ছাড়া আয়া অক্সিজেন খুলে নেওয়ার কারণে এই মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে শিশুর পিতা নূর ইসলাম, ঘোপ এলাকার আব্দুল বারিক শেখ সহ উপস্থিত ক্ষুব্ধ স্বজন ও সাধারণ মানুষ হাসপাতালের ভেতরেই তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তারা আয়া নাজমা বেগমকে এই মৃত্যুর জন্য সরাসরি দায়ী করে হাসপাতাল চত্বরে বিক্ষোভ শুরু করলে চরম বিশৃঙ্খলা ও তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়।
অ্যাম্বুলেন্স চালক ও শিশুর পিতার অভিযোগ, ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া আয়া যদি জোরপূর্বক অক্সিজেনের পাইপটি খুলে পরিবর্তন না করতেন, তবে হয়তো অবুজ সন্তানটিকে এভাবে অকালে মরতে হতো না। পরে আত্মীয় স্বজনরা চোখের জলে মৃত শিশুকে নিয়ে নিজ বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন।
এ ব্যাপারে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়াত এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, আয়া নাজমা বেগম রোগীর লোকজনের কাছে বহন খরচ বাবদ ১০০ টাকা চেয়েছিলেন। রোগীর লোকজন তা দিতে রাজি না হওয়ায় তিনি চিকিৎসকের কোনো পরামর্শ ছাড়াই শিশুদের অক্সিজেন খুলে বড়দের অক্সিজেন মাস্ক লাগিয়ে দেন এবং এর কিছুক্ষণ পরই শিশুটি মারা যায় বলে রোগীর স্বজনরা এ তথ্য জানিয়ে লিখিত অভিযোগ করেছেন। হাসপাতাল খোলার পর পরই বিষয়টি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে এবং সরকারি নিয়ম ভেঙে চিকিৎসকের কাজে হস্তক্ষেপ ও অবহেলার কারণে ওই আয়ার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।